স্ফুলিঙ্গ ডেক্স :
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে দীর্ঘ চার বছর ধরে সম্পূর্ণ ‘ক্লুলেস’ ও রহস্যে ঘেরা থাকা শিপ্রা রানী দাস হত্যা মামলার মূল রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। একই সাথে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও প্রধান আসামি তাজুল ইসলাম প্রকাশ কাজলকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে সংস্থাটি। পরকীয়া সম্পর্কের জটিলতা ও বিষয়টি জানাজানি হওয়ার ভয়েই ভিকটিমকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে পিবিআই।
গত ২২ জুন ২০২৬ তারিখ রাত সাড়ে ১২টার দিকে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী রেলস্টেশন এলাকা থেকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পিবিআই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ভিকটিম শিপ্রা রানী দাস জীবিকার তাগিদে স্থানীয় কালু বাবুর্চি এবং গ্রেপ্তারকৃত তাজুল ইসলাম কাজলের সাথে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে রান্নার সহকারী (হেল্পার) হিসেবে কাজ করতেন। গত ১ অক্টোবর ২০২১ তারিখে তিনি কাজের উদ্দেশ্যে নিজ বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন। এর তিন দিন পর, ৪ অক্টোবর ২০২১ তারিখে নবীনগর থানাধীন নবীপুর এলাকার জলার চরে ফাইজুল হকের একটি ফসলি জমি থেকে তাঁর অর্ধগলিত ও বীভৎস মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
মরদেহ শনাক্তের পর ভিকটিমের স্বামী সবিনয় দাস বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে নবীনগর থানায় একটি মামলা (নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯/২ ধারা এবং পেনাল কোডের ২০১ ধারায়) দায়ের করেন। নবীনগর থানা পুলিশ দীর্ঘ ৬ মাস ১১ দিন মামলাটি তদন্ত করলেও কোনো ক্লু বা অপরাধীকে শনাক্ত করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের নির্দেশে ২০ জুলাই ২০২২ তারিখে পিবিআই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা স্ব-উদ্যোগে এই মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে।
পিবিআই-তে হস্তান্তরের পর মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক মো. শফিকুর রহমান ভূঁইয়া দীর্ঘ তদন্তের পর গত ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখে নারায়ণগঞ্জ থেকে এই হত্যাকাণ্ডের অন্যতম সহযোগী আসামি কালু বাবুর্চি প্রকাশ কালু সাহা (৫৫)-কে গ্রেপ্তার করেন। পরবর্তীতে তদন্ত কর্মকর্তার অবসর ও বদলিজনিত কারণে গত ২২ মে ২০২৬ তারিখে বর্তমান তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই (নিঃ) মো. শাহাদাত হোসেন মামলার দায়িত্ব নেন। দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ঘটনার মূল হোতা তাজুল ইসলাম কাজলকে নোয়াখালী থেকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হন তিনি।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃত ঘাতক কাজল অপরাধের কথা স্বীকার করে জানায়, কাজের সূত্রে ভিকটিম শিপ্রা রানীর সাথে তাঁর গভীর পরকীয়া সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে এই অনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি চারদিকে প্রকাশ হয়ে যাওয়ার তীব্র আশঙ্কায় সে শিপ্রাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করে। ঘটনার দিন সুযোগ বুঝে সে শিপ্রাকে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণের পর দুই হাত দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এরপর আলামত ও মরদেহ গোপনের উদ্দেশ্যে জলার চরের ফসলি জমিতে লাশ ফেলে রেখে নোয়াখালীতে গিয়ে আত্মগোপন করে।
পিবিআই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দীর্ঘ ৪ বছরের নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টায় এই ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য ও অপরাধী উন্মোচিত হলো। গ্রেপ্তারকৃত আসামিকে যথাযথ আইনি বিধি মোতাবেক বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য তদন্ত কার্যক্রম এখনো অব্যাহত রয়েছে। ছবি সংগৃহীত।

