চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি:
চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় প্রবাসী পিতার একমাত্র সন্তান কিশোর মোঃ রাফিজ মিয়া (১৫)-কে মুক্তিপণের উদ্দেশ্যে নির্মমভাবে অপহরণ ও শ্বাসরোধ করে হত্যার ঘটনায় মূল পরিকল্পনাকারী ও প্রধান আসামী মোঃ লাল্টু মিয়া (৪১)-কে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রশিসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃত আসামী বিজ্ঞ আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করে লোমহর্ষক স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছে।
গতকাল শুক্রবার (২৬ জুন) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি থানাধীন নলিয়া গ্রাম রেলস্টেশন সংলগ্ন জামালপুর বাজার এলাকায় এক যৌথ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃত লাল্টু মিয়া চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার শিবপুর গ্রামের মোঃ শুকুর আলীর ছেলে।
মামলার এজাহার ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ জুন ২০২৬ তারিখ সাড়ে ৭টার দিকে আলমডাঙ্গা উপজেলার চিলাভালকী গ্রামের ওমান প্রবাসীর ছেলে রাফিজ মিয়াকে অজ্ঞাতনামা আসামীরা মোবাইল ফোনে কল করে কৌশলে ডেকে নিয়ে অপহরণ করে। ওই দিনই রাত ১১টার দিকে আসামীর মোবাইল থেকে রাফিজের নানী মোছাঃ আমেনা খাতুনের ফোনে কল দেওয়া হয়। ফোনের ওপাশ থেকে রাফিজের কান্নাজড়িত ও আর্তনাদের কণ্ঠ শুনিয়ে ১২ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয় এবং বিষয়টি পুলিশ বা অন্য কাউকে জানালে রাফিজকে জবাই করে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে পরিবার টাকা দিতে ব্যর্থ হলে ওই রাতেই রাফিজকে নির্দয়ভাবে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় গত ১০ জুন আলমডাঙ্গা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়।
পরবর্তীতে গত ১৩ জুন চুয়াডাঙ্গা সদর থানাধীন কুতুবপুরের লাল ব্রিজ মাঠ সংলগ্ন অর্জুন খালের পাশে জনৈক মজিদের জমির পুকুর থেকে রাফিজ মিয়ার গলিত ও ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে চুয়াডাঙ্গা সদর থানা পুলিশ।
হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতা বিবেচনায় চুয়াডাঙ্গা জেলার পুলিশ সুপার জনাব মোহাম্মদ রুহুল কবীর খানের বিশেষ নির্দেশনায় জেলা পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেল এবং আলমডাঙ্গা থানার তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিদর্শক মোঃ হোসেন আলীর সমন্বয়ে একটি চৌকস দল তদন্তে নামে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আসামীর অবস্থান শনাক্ত করে রাজবাড়ী থেকে প্রধান আসামী লাল্টুকে হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে প্রধান আসামী লাল্টু জানায়, রাফিজের বাবা দীর্ঘদিন যাবত বিদেশে থাকার কারণে তাদের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল। তাকে অপহরণ করতে পারলে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে—এমন লোভ থেকেই এই নিখুঁত ছক আঁকা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৫ জুন রাতে রাফিজকে ডেকে মোটরসাইকেলে করে কুতুবপুরের অর্জুন খালের নির্জন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে হাত-পা বেঁধে মারধর করার পর তার ফোন থেকেই পরিবারের কাছে ১২ লাখ টাকা চাওয়া হয়। টাকা না পেয়ে ওই রাতেই রাত সাড়ে ১১টার দিকে রশি দিয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে শ্বাসরোধ করে রাফিজকে হত্যা করে তারা এবং লাশ অর্জুন খালে ফেলে দেয়। নৃশংসতার চরম রূপ দেখিয়ে আসামী লাল্টু রাফিজকে হত্যার পরও তার পরিবারকে বিভ্রান্ত করতে একাধিকবার ফোনে মুক্তিপণের টাকা দাবি করে আসছিল।
গ্রেফতারের পর আসামী লাল্টুর দেওয়া তথ্য ও স্বীকারোক্তি মোতাবেক অর্জুন খালের ঘটনাস্থল থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সেই রশিটি উদ্ধার করেছে পুলিশ। গতকালই আসামীকে কড়া নিরাপত্তায় চুয়াডাঙ্গা বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হলে সে বিচারকের নিকট ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় ভিকটিমকে অপহরণ ও সরাসরি শ্বাসরোধ করে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। এই রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্য আসামীদের অবিলম্বে গ্রেফতারের লক্ষ্যে পুলিশের চিরুনি অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা পুলিশ। ছবি সংগৃহীত।

