স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
‘সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে মোরা পরের তরে’— কবি কামিনী রায়ের এই অমর বাণীকে আবারও বাস্তব সমাজে অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণ করল যশোর জেলা প্রশাসন। যশোর-মাগুরা মহাসড়ক সংলগ্ন উপশহর ইউনিয়নের নিউমার্কেট হাউজিং এস্টেটের ট্রাক স্ট্যান্ডের পাশে রজনীগন্ধা ১০ তলা ফ্ল্যাটের সামনের রাস্তায় টানা ৮-১০ দিন ধরে খোলা আকাশের নিচে ধুঁকে ধুঁকে মরতে বসা এক অজ্ঞাতনামা বৃদ্ধা মাকে অবশেষে উদ্ধার করা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) দুপুরে একটি বিশেষ মানবিক নিউজের সূত্র ধরে বিষয়টি সরাসরি যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসানের নজরে আসলে তিনি তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও ট্রাক স্ট্যান্ডের শ্রমিকদের বরাতে জানা গেছে, আনুমানিক ৮ থেকে ১০ দিন আগে দূরপাল্লার একটি যাত্রীবাহী বাস থেকে অজ্ঞাতনামা কতিপয় পাষণ্ড ব্যক্তি ওই বৃদ্ধা মহিলাকে মহাসড়কের পাশে এক প্রকার ছুড়ে ফেলে দিয়ে দ্রুত চম্পট দেয়। বৃদ্ধাটি হাঁটতে বা নিজের পরিচয় স্পষ্ট করে বলতে না পারায় তিনি ওই রজনীগন্ধা ভবনের সামনের রাস্তার ধুলোবালিতেই পড়ে ছিলেন। পরে স্থানীয় কিছু মানবিক রিকশাচালক ও ব্যবসায়ী মিলে রোদ-বৃষ্টি থেকে বাঁচাতে তাকে রাস্তার পাশেই খোলা আকাশের নিচে সামান্য পলিথিন ও চট দিয়ে থাকার ব্যবস্থা করে দেন এবং চারপাশের মানুষ যা খাবার দিতেন, তা খেয়েই কোনো রকমে বেঁচে ছিলেন তিনি।
আজ ২৫ জুন এই মরণাপন্ন বৃদ্ধার করুণ দিনযাপনের একটি সচিত্র প্রতিবেদন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও স্থানীয় নিউজ পোর্টালে প্রকাশ হলে তা দ্রুত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসানের দৃষ্টিগোচর হয়। তিনি বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে ঘটনাটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে যশোর সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং যশোর সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে সশরীরে মাঠে নামার নির্দেশ দেন।
ডিসি’র কড়া নির্দেশে উপজেলা প্রশাসন ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের একটি বিশেষ টিম দ্রুত উপশহর নিউমার্কেট এলাকায় স্থানীয়দের সহায়তায় জরাজীর্ণ ও রোগাক্রান্ত অবস্থায় পড়ে থাকা ওই অসহায় বৃদ্ধাকে পরম মমতায় উদ্ধার করে এবং একটি অ্যাম্বুলেন্স যোগে সরাসরি যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসে।
হাসপাতাল ও সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, উদ্ধারকৃত বৃদ্ধা প্রচণ্ড অসুস্থ, দুর্বল ও স্মৃতিভ্রম রোগে ভুগছেন। তিনি নিজের নাম, ধাম বা কোনো স্বজনের পরিচয় বিন্দুমাত্র জানাতে পারছেন না। বর্তমানে তিনি সম্পূর্ণ সরকারি খরচে হাসপাতাল সমাজসেবা কর্মকর্তার সরাসরি তত্ত্বাবধান ও নার্সিং প্রটোকলে যশোর জেনারেল হাসপাতালের ফিমেল মেডিসিন ওয়ার্ডে নিবিড় চিকিৎসাধীন আছেন।
যশোর সদর উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, এই পরিচয়হীন মায়ের স্থায়ী আশ্রয়ের জন্য ইতিপূর্বে সমাজসেবামূলক কাজে নিয়োজিত স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের স্বনামধন্য এনজিও ও বৃদ্ধাশ্রমগুলোর সাথে জরুরি যোগাযোগ শুরু করা হয়েছে। চিকিৎসকদের বোর্ডের অধীনে উদ্ধারকৃত এই বৃদ্ধার শারীরিক অবস্থার প্রয়োজনীয় উন্নতি ও স্মৃতিশক্তি কিছুটা ফিরে আসলেই, তাকে একটি নিরাপদ ও যথাযথ স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে জেলা প্রশাসন। প্রশাসনের এমন দ্রুত ও মানবিক পদক্ষেপে যশোরজুড়ে সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক প্রশংসা ও স্বস্তি নেমে এসেছে।ছবি সংগৃহীত।

