স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
যশোর জেলা রেজিস্ট্রারের বিদায় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সরকারি বিধিমালা ও চাকুরির শৃঙ্খলা ভঙ্গের এক চরম নজিরবিহীন জালিয়াতি, বিপুল অঙ্কের বাধ্যতামূলক চঁাদা আদায় এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা শত শত সাধারণ মানুষের জরুরি আইনি জমি-জমা সংক্রান্ত সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ রেখে, কোনো প্রকার ছুটির দরখাস্ত ছাড়াই জেলার সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এই ‘রাজকীয়’ বিদায় অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার এক অদ্ভুত ও অলিখিত ফরমান জারি করেছে কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশন। সরকারি কর্মদিবসে জনসেবা বন্ধ রেখে এমন বিতর্কিত উৎসব ও দুর্নীতির মহোৎসব নিয়ে খোদ দপ্তরের ভেতরেই তীব্র ক্ষোভ এবং নানামুখী রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ১৭ জুন বুধবার দুপুরে বাংলাদেশ রেজিস্ট্রেশন এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশন যশোর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ও প্রভাবশালী মোহরার সামছুজ্জামানের (মিলন) সুনির্দিষ্ট আহ্বানে যশোর জেলা রেজিস্ট্রি অফিসের দ্বিতীয় তলায় এক অত্যন্ত গোপনীয় বৈঠকের আয়োজন করা হয়। জেলা শাখার সভাপতি রবিউল ইসলামের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদকের নিখুঁত সঞ্চালনায় ওই সভায় বক্তব্য রাখেন মঞ্জুয়ারা খাতুন, প্রভাষ দত্ত, শেখর, লক্ষ্মী, বিপ্লবসহ অ্যাসোসিয়েশনের বিভিন্ন পদের নেতারা।
উক্ত সভায় আগামী ২৫ জুন বৃহস্পতিবার জেলা রেজিস্ট্রারের বিদায় অনুষ্ঠান মহাসমারোহে ও জাকজমকপূর্ণভাবে উদযাপনের এক মৌখিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। অনুষ্ঠান সফল করতে এবং বিদায়ী সাহেবকে খুশি করতে জেলার মোট ৯টি উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে বাধ্যতামূলকভাবে ৫০ হাজার টাকা করে মোট ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা চঁাদা (টোল) নির্ধারণ করা হয়। এই বিপুল পরিমাণ চঁাদার টাকা গত ২১ ও ২২ জুনের মধ্যে সভাপতি রবিউল বা সাধারণ সম্পাদক মিলনের কাছে নগদ জমা দেওয়ার এক চূড়ান্ত নির্দেশ জারি করা হয়েছিল।
সভার অলিখিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২৫ জুন বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে শুরু করে দুপুর ৩টা পর্যন্ত এই বিদায় সংবর্ধনার মহোৎসব চলবে এবং দুপুরে আমন্ত্রিত হাইপ্রোফাইল অতিথিদের জন্য ‘ভিআইপি’ ও রাজকীয় খাবারের এলাহী ব্যবস্থা থাকবে। তবে সবচেয়ে নজিরবিহীন ও বেআইনি সিদ্ধান্ত হলো— ওই দিন জেলার ৯টি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কোনোটিতেই সাধারণ মানুষকে কোনো প্রকার আইনি সেবা বা দলিল রেজিস্ট্রি দেওয়া হবে না। কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী সরকারের কাছে ছুটির দরখাস্ত ছাড়াই বেআইনিভাবে একযোগে কর্মস্থল ত্যাগ করে বিদায় অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। সেবা প্রত্যাশী সাধারণ মানুষ ও দলিল দাতা-গ্রহীতারা যাতে কড়া তালা দেখে ক্ষুব্ধ না হন, সেজন্য প্রতিটি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে শুধুমাত্র একজন করে দৈনিক মজুরির উমেদার (পিয়ন) চেয়ারে বসিয়ে রেখে অফিস খোলা রাখার এক অদ্ভুত নাটক সাজানো হয়েছে। ফলে এদিন দূর-দূরান্ত থেকে জমি কেনাবেচা করতে আসা শত শত মানুষ চরম হয়রানি ও আর্থিক ক্ষতির শিকার হবেন বলে সচেতন মহল আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
সবচেয়ে বড় দুর্নীতির প্রশ্ন উঠেছে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথিকে নিয়ে। আগামী ২৫ জুন একই দিনে জেলা সদর রেজিস্ট্রি অফিস বার্ষিক অডিট (নিরীক্ষা) করার কথা রয়েছে সরকারের আইআরও মাহফুজুর রহমান খঁানের। অথচ দুর্নীতি ও হিসাবের খতিয়ান ঢাকতে তাকেই এই জমকালো বিদায় অনুষ্ঠানের ‘প্রধান অতিথি’ করার এক মোক্ষম চাল চেলেছে কতিপয় কর্মকর্তা। এছাড়া খুলনা বিভাগের সকল জেলা রেজিস্ট্রারকে এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার বিশেষ আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। প্রতিটি উপজেলা থেকে দলিল লেখক সমিতির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক এবং নকল নবীশদের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে বাধ্যতামূলকভাবে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারি অতি গুরুত্বপূর্ণ অডিটের দিনে এমন চোখ ধাঁধানো আয়োজন এবং অডিট অফিসারকে প্রধান অতিথি করার পেছনে কোনো গভীর ব্যক্তিস্বার্থ, হিসাবের গরমিল ধামাচাপা দেওয়া বা আর্থিক সমঝোতা রয়েছে কি না, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা মুখরোচক প্রশ্ন উঠেছে।
হঠাৎ একজন জেলা রেজিস্ট্রারকে বিদায় জানাতে এত বিপুল টাকা খরচ ও রাষ্ট্রীয় নিয়ম ভাঙার পেছনে বড় ধরনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট রহস্য রয়েছে বলে রেজিস্ট্রি অফিসের ভেতরের একটি বিশ্বস্ত সূত্র নিশ্চিত করেছে। বিদায় অনুষ্ঠানের এই সাড়ে ৪ লাখ টাকার হিসাব ও খরচের পুরো খতিয়ান রাখবেন শুধু সমিতির সভাপতি রবিউল ও সাধারণ সম্পাদক মিলন; যার কোনো অডিট বা হিসাব অন্য কোনো সাধারণ কর্মচারী জানতে পারবে না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই বিশাল রাজকীয় আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য হলো বিদায়ী জেলা রেজিস্ট্রারকে চরমভাবে সন্তুষ্ট করা, যাতে তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে আসা অডিট অফিসার এবং পরবর্তীতে যশোরে দায়িত্ব নিয়ে আসা নতুন জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে মোহরার সামছুজ্জামানের (মিলন) নাম বিশেষভাবে সুপারিশ বা ওকালতি করে যান। এর মাধ্যমে ধুরন্ধর সামছুজ্জামান মিলন যেন ভবিষ্যৎ দিনগুলোতেও জেলা রেজিস্ট্রি অফিসের যাবতীয় অবৈধ টেবিল কালেকশন, ঘুষের টাকা ভাগাভাগি এবং কর্মচারীদের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলি বাণিজ্য ও সিন্ডিকেট একক নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন।
সরকারি নিয়মনীতি ও চাকুরির আচরণবিধি সম্পূর্ণ বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, সাধারণ মানুষের জনসেবা এক প্রকার জিম্মি করে কর্মদিবসে এমন বিতর্কিত উৎসব আয়োজনের বিষয়ে যশোরের সচেতন নাগরিক সমাজ ও ভুক্তভোগী সেবা প্রত্যাশীরা আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের আইজিআরসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ এবং গোয়েন্দা তদন্তের জোর দাবি জানিয়েছেন। ফাইল ছবি সংগৃহীত।


