নাভারণে আত্মগোপন ভেঙে মাঠে আওয়ামী লীগের ‘শিকদার সিন্ডিকেট’

নাভারণে আত্মগোপন ভেঙে মাঠে আওয়ামী লীগের ‘শিকদার সিন্ডিকেট’

স্ফুলিঙ্গ  রিপোর্ট :

যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার নাভারণ ইউনিয়ন ও তার আশপাশের সীমান্তঘেঁষা প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিগত সরকারের আমলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কতিপয় দাগী নেতাকর্মী পুনরায় প্রকাশ্যে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন বলে তীব্র অভিযোগ উঠেছে। দেশের পটপরিবর্তনের পর দীর্ঘদিন আত্মগোপনে বা ফেরারি থাকার পর হঠাৎ করেই তারা ডেরা থেকে বের হয়ে এলাকায় এসে প্রকাশ্যে বুক ফুলিয়ে চলাফেরা শুরু করেছেন। জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় দমন-পীড়নে জড়িত এই সিন্ডিকেটের আকস্মিক প্রত্যাবর্তনে নাভারণের সাধারণ ডাল-ভাত খাওয়া মানুষ এবং বিরোধী মতের স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে তীব্র উদ্বেগ ও নতুন করে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।

নাভারণের স্থানীয় নির্ভরযোগ্য ও মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, নাভারণ ইউনিয়নের রঘুনাথপুর ডাঙ্গী গ্রামকে মূল ঘাঁটি বা সেফহাউজ বানিয়ে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও বেশ কয়েকজন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মী পুনরায় জোটবদ্ধ হচ্ছেন। এই পুনরুত্থান চক্রের প্রথম সারির মাথাদের মধ্যে রয়েছেন— ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি কাশেম শিকদার, ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক রবি শিকদার, ছাত্রলীগ নেতা ইমরান শিকদার, ইয়াসিন শিকদার, প্রভাবশালী আবুল কালাম ও আলাল উদ্দিনসহ আরও অজ্ঞাতনামা ৫ থেকে ৭ জন।

ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘ দেড় দশক ধরে আওয়ামী লীগের ক্ষমতার দাপট ও অস্ত্রের গরম দেখিয়ে এই ব্যক্তিরা নাভারণ এলাকায় একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সাধারণ মানুষের ওপর জুলুম, ভুয়া সালিশ বাণিজ্য করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া, নিরীহ মানুষের ভিটেমাটি ও ফসলি জমি দখল, হাটে-বাজারে নিয়মিত চাঁদাবাজি এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ডজন ডজন হামলা-মামলা দেওয়াই ছিল এদের প্রধান কাজ। স্থানীয়দের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত মনে হওয়ায় তারা আবারও এলাকায় একজোট হয়ে গোপন বৈঠক করছেন এবং রাতের অন্ধকারে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ও বিরোধী মতের লোকজনকে বিভিন্নভাবে মামলা ও দেখে নেওয়ার ভয়ভীতি প্রদর্শন করছেন।

নাভারণের একাধিক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে সংবাদমাধ্যমকে জানান, জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনের সময় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বরোচিত হামলা ও দমন-পীড়নের ঘটনায় এই সুনির্দিষ্ট নেতাদের বিরুদ্ধে জোরালো অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তারা এখনো বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তারা প্রকাশ্যে হাট-বাজারে চায়ের আড্ডায় মহড়া দিলেও স্থানীয় পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো দৃশ্যমান বা সাঁড়াশি পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। যার ফলে ঝিকরগাছায় পুলিশের প্রকৃত ভূমিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে নানামুখী খটকা ও প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

স্থানীয়দের আরও জোরালো দাবি, কাশেম শিকদার ও আবুল কালাম মোটা অঙ্কের অবৈধ অর্থ ছিটিয়ে এবং স্থানীয় কিছু মহলের সাথে গভীর সমঝোতা করে এলাকায় বুক ফুলিয়ে অবস্থান করছেন। এ বিষয়ে নিজের জমি হারানো চরম ভুক্তভোগী ও নাভারণের বাগ গ্রামের সক্রিয় বিএনপি কর্মী রেজাউল ইসলাম তাঁর ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “বিগত ২০২৪ সালে ক্ষমতার চূড়ান্ত অপব্যবহার করে আমার পৈত্রিক ও রেকর্ডিয় প্রায় পাঁচ শতক মূল্যবান জমি জোরপূর্বক লাঠির জোরে দখল করে নেয় এই সিন্ডিকেট। ওই ন্যাক্কারজনক জবরদখলের মূল নেপথ্যে এবং সরাসরি স্পটে উপস্থিত ছিলেন কাশেম শিকদার ও রবি শিকদার।” নতুন বাংলাদেশেও নিজের জমি ফেরত না পেয়ে তিনি চরম হতাশায় ভুগছেন। তবে এসব গুরুতর ও স্পর্শকাতর অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত কাশেম শিকদার বা রবি শিকদার বাহিনীর কারো সাথেই যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি এবং তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নাভারণে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের এই পুনরায় সংগঠিত হওয়া এবং সাধারণ মানুষের ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টির বিষয়ে ঝিকরগাছা থানার সদ্য যোগদানকৃত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম কিবরিয়া অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সাথে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমি এই থানায় একেবারে নতুন যোগদান করেছি। নাভারণ বা রঘুনাথপুর ডাঙ্গী গ্রামের সার্বিক পরিস্থিতি আমার কঠোর নজরদারিতে রয়েছে। জমি দখল, চাঁদাবাজি বা সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখানোর কোনো সুযোগ এই স্বাধীন বাংলাদেশে আর কাউকেই দেওয়া হবে না। অভিযোগগুলোর সত্যতা ও গভীরতা নিখুঁতভাবে তদন্ত করে খুব দ্রুতই অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা এবং ভয়ের পরিবেশ দূর করতে ঝিকরগাছা থানা পুলিশ খুব শীঘ্রই ওই অঞ্চলে একটি বিশেষ ঝটিকা অভিযান চালাবে বলে স্থানীয় সচেতন মহল জোরালো প্রত্যাশা করছেন। ছবি সংগৃহীত।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *