ঝিকরগাছা (যশোর) প্রতিনিধি:
যশোরের ঝিকরগাছায় আপন নাতনিকে বখাটে ও সন্ত্রাসীদের উত্ত্যক্ত করার তীব্র প্রতিবাদ করায় রাজমিস্ত্রি এনামুল সরদারকে (৫৫) নৃশংসভাবে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় আন্তর্জাতিকভাবে এক বড় সাফল্য পেয়েছে পুলিশ। চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী, নেপথ্যের মাস্টারমাইন্ড, হুকুমদাতা ও অর্থ জোগানদাতা রবিউল ইসলাম (৪৫) অবশেষে সুদূর মালয়েশিয়া পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন। বর্তমানে তিনি মালয়েশিয়ার একটি কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক রয়েছেন এবং তাকে ইন্টারপোল বা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার সব ধরনের দাপ্তরিক প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। নিহত এনামুল সরদার ঝিকরগাছা সদর ইউনিয়নের ফারাসাতপুর গ্রামের মৃত আব্দুর রহিমের পুত্র এবং পেশায় একজন রাজমিস্ত্রি ছিলেন।
মামলার বিবরণ ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ৮ জুন ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ (সোমবার) রাত ৯টার দিকে এনামুল সরদার স্মরণপুর জামতলা মোড় থেকে হেঁটে নিজের বাড়ি ফিরছিলেন। পথিমধ্যে মনিরামপুর থানার রোহিতা ইউনিয়নের স্মরণপুর বাঁশতলা তিন রাস্তার মোড়ে মতিনের দোকানের সামনে পৌঁছামাত্র পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ওৎ পেতে থাকা একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী তাঁর ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। ঘাতকেরা ভারী ও ধারালো চাপাতি দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে, চাকু মেরে এবং হাতুড়ি ও লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে এনামুলকে রাস্তার ওপর নৃশংসভাবে হত্যা করে পালিয়ে যায়।
এই বর্বরোচিত ঘটনার পরদিন ৯ জুন মনিরামপুর থানায় ৩০২/৩৪ দণ্ডবিধি ধারায় একটি নিয়মিত হত্যা মামলা দায়ের করা হয় (যার মামলা নম্বর-১১)। মামলায় ফারাসাতপুর গ্রামের হুসাইন (২২), রাকিব (২০), রাব্বি (২২), চঞ্চল (৩২), সাকিব (২০), আরিফ (২৭), মেহেদী (২৫), সিয়াম (১৯), ইউনুস (২৪), মিঠু (২৪) এবং শওকত সরদারের ছেলে প্রধান পরিকল্পনাকারী রবিউলসহ (৪৫) অজ্ঞাতনামা আরও ৪/৫ জনকে আসামি করা হয়।
মামলার প্রধান তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) মনিরুজ্জামান হাজরা চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে জানান, হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা রবিউল ইসলাম অত্যন্ত চতুরতার সাথে খুন সম্পন্ন হওয়ার পরপরই ওই রাতেই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন এবং ৯ জুন সকাল সাড়ে ৬টার আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন। অন্যদিকে, ৯ জুন সকালে আসামিদের নামে মামলা রুজু হওয়ার সাথে সাথেই বাংলাদেশের সকল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসামিদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করা হয়।
রবিউল দেশ ছেড়ে পালালেও রেহাই পাননি। তদন্ত কর্মকর্তা দ্রুত মালয়েশিয়া ইমিগ্রেশন ও রয়্যাল মালয়েশিয়ান পুলিশের সাথে বিশেষ যোগাযোগ স্থাপন করেন। এর সূত্র ধরে গত ১০ জুন মালয়েশিয়ার স্থানীয় সময় বেলা ১২টার দিকে কুয়ালালামপুরের শিলংগর, গুডিয়ার কোট ১০ ইউএসজে ১৫ (শুভং পারডানার বিল্ডিং নম্বর এইউ ০০-০৬) এলাকায় অবস্থিত ‘রেস্টুরেন্ট আল জাজ’ নামক একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঘাতক রবিউলকে হাতেনাতে গ্রেফতার করে মালয়েশিয়া পুলিশ।
মনিরামপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু সাঈদ জানান, নির্মম এই হত্যাকাণ্ডের সংবাদ পাওয়ার পর থেকেই পুলিশ আসামিদের গ্রেফতারে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে। ইতিমধ্যে মামলার ১ নম্বর আসামি হুসাইনকে পুলিশ এবং এজাহারভুক্ত আসামি রাব্বি ও রাকিবকে র্যাবের বিশেষ অভিযানে আটক করা হয়েছে। ১ নম্বর আসামি হুসাইন বিজ্ঞ আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নিজের অপরাধ স্বীকার করে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দিয়েছে এবং হত্যাকাণ্ডে রবিউলসহ অন্যান্য আসামিদের সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নিশ্চিত করেছে।
ওসি আরও জানান, মামলার বাকি আসামিদের ধরতে জেলাজুড়ে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে এবং বেশ কয়েকজন ঘাতককে ইতিমধ্যেই কড়া নজরদারিতে রাখা হয়েছে। খুব শীঘ্রই তাদের গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতের মুখোমুখি করা হবে এবং পলাতক বাকি আসামিদের গ্রেফতারে চিরুনি অভিযান অব্যাহত থাকবে। ফাইল ছবি সংগৃহীত।

