প্রধানমন্ত্রীর ‘খাল খনন’ নির্দেশনার তোয়াক্কা নেই যশোরে!

প্রধানমন্ত্রীর ‘খাল খনন’ নির্দেশনার তোয়াক্কা নেই যশোরে!

স্ফুলিঙ্গ  রিপোর্ট :

দেশবাসীর কল্যাণ, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং কৃষকদের সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশব্যাপী হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছেন। জনগণের সুবিধার্থে রাষ্ট্রপ্রধানের এই পরিবেশবান্ধব ও যুগান্তকারী নির্দেশনা যখন দেশজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছে, তখন যশোরে তার ঠিক উল্টো চিত্র দেখা গেছে। প্রধানমন্ত্রীর এই বিশেষ অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যশোরের উপশহর তেঁতুলতলা এলাকার একটি ঐতিহাসিক ও শতবর্ষী প্রাকৃতিক খাল ভরাট করে প্লট বাণিজ্যে মেতে উঠেছে স্থানীয় হাউজিং কর্তৃপক্ষ। ৬০ ফুট চওড়া প্রবহমান খালটিকে মাত্র ৩ ফুটের একটি নামকাওয়াস্তে কংক্রিটের ড্রেনে রূপান্তর করে পুরো এলাকাকে স্থায়ী জলাবদ্ধতার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

অনুসন্ধানে ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্যে জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে লোকদেখানো বিতর্কিত লটারির আড়ালে এই শতবর্ষী খালটি ভরাটের চূড়ান্ত নীল নকশা করা হয়। অভিযোগের তির হাউজিং কর্তৃপক্ষের ‘এও’ (Administrative Officer) তুহিন এবং তৎকালীন স্থানীয় প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধিদের সিন্ডিকেটের দিকে। নিজেদের আইনিভাবে ‘ক্লিন’ বা দায়মুক্ত রাখতে তারা লটারির নাটক সাজিয়ে মোটা অঙ্কের গোপন বাণিজ্যের মাধ্যমে খালের জমিতে নতুন করে নকশা তৈরি করে ১০টি প্লট বরাদ্দ দেয়।

বাস্তবে এই প্লট বাণিজ্যের নামে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হয়েছে বলে এখন উপশহরের মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। এই অপকর্ম করতে গিয়ে খালপাড়ে বিগত ৫০-৬০ বছর ধরে রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বসবাস করা অত্যন্ত অসহায় ও ছিন্নমূল মানুষদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হয়েছে। গরিবদের তাড়িয়ে সেই খালের জমি এখন তুলে দেওয়া হচ্ছে সমাজের বিত্তশালীদের হাতে।

সরেজমিনে উপশহরের তেঁতুলতলা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, যেখানে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ ফুট প্রশস্ত একটি বিশাল প্রাকৃতিক খাল ছিল, সেটি এখন পুরোপুরি বিলীন হওয়ার পথে। প্রতিদিন ট্রাকে ট্রাকে মাটি ও রাবিশ ফেলে খালের বুক ভরাট করা হচ্ছে। বিতর্কিত উপায়ে বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তিরা বর্তমানে সেখানে জমি বুঝে নিয়ে মাটি ভরাটের কাজ পুরোদমে সচল রেখেছেন।

বিশাল এই খালের ঠিক মাঝখান দিয়ে পানি যাওয়ার জন্য মাত্র ৩ ফুটের একটি নামকাওয়াস্তে সরু ড্রেন করা হয়েছে। তবে এখানেও চরম চালাকি ও ফাঁকিবাজির আশ্রয় নিয়েছে হাউজিং কর্তৃপক্ষ। জানা গেছে, খালের যে অংশটুকু পর্যন্ত নতুন প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, ঠিক সেই সীমানা পর্যন্তই কেবল এই নামকাওয়াস্তে ৩ ফুটের ড্রেনটি নির্মাণ করা হয়েছে। খালের বাকি অংশটুকুতে কোনো ড্রেন না করেই সম্পূর্ণ অরক্ষিত ও অবহেলিত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে, যা কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতি ও লোকদেখানো কর্মকাণ্ডকে স্পষ্ট করে তোলে।

এলাকার ৫০-৬০ বছর বয়সী প্রবীণ বাসিন্দারা ক্ষোভ ও দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানান, “আমরা জন্মের পর থেকে এই বিশাল খাল দেখে আসতেছি। পুরো এলাকার পানি এই খাল দিয়ে অনায়াসে বের হয়ে যেত ও ভৈরব নদীতে গিয়ে মিশতো।। কিন্তু আজ চোখের সামনে টাকার গরমে পুরো খালটি ভরাট করে বিলীন করে দেওয়া হলো।”

এলাকাবাসী সুনির্দিষ্টভাবে দাবি করছেন, এই শতবর্ষী প্রাকৃতিক খালটি ভরাটের কারণে পুরো উপশহর ও পার্শ্ববর্তী নিউমার্কেট এলাকায় অচিরেই এক ভয়াবহ ও কৃত্রিম জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হবে। সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যাবে বিস্তীর্ণ জনপদ ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। কারণ, হাউজিং কর্তৃপক্ষের আংশিক ও লোকদেখানো ৩ ফুটের ড্রেন দিয়ে এই বিশাল অঞ্চলের বিপুল পরিমাণ পানি নিষ্কাশন হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

এ বিষয়ে যশোর হাউজিং এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মোঃ আশিক আহমেদ সাকিবের সাথে কথা বললে তিনি জানান সব নিয়মকানুন মেনেই এই খালটি ভরাট করে প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।এটুকু বলেই তিনি আর কোন তথ্য দিতে রাজি হননি।

পয়সার লোভে খালের মতো একটি প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট করার এই হঠকারী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এখন ফুঁসে উঠেছে স্থানীয় উপশহরের বাসিন্দারা। তারা ঐতিহ্যবাহী এই শতবর্ষী খালটি আগের রূপে পুনরুদ্ধার করার দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছেন এবং অনতিবিলম্বে বড় ধরনের গণ-আন্দোলনে নামার জোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একই সাথে, প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশবান্ধব নির্দেশ অমান্যকারী হাউজিংয়ের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের শাস্তির মুখোমুখি করতে তারা সরাসরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে কীভাবে বহুতল ভবনের পাশে থাকা ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী খালের বিশাল অংশ মাটি ও ইট-পাথরের রাবিশ ফেলে ভরাট করা হয়েছে এবং খালের অস্তিত্ব বিলীন করে একপাশে নামকাওয়াস্তে একটি সরু ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে।— ছবি: সংগৃহীত

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *