একবিংশ শতাব্দীতেও কন্যা জন্ম দেওয়া ‘মহাপাপ’!

একবিংশ শতাব্দীতেও কন্যা জন্ম দেওয়া ‘মহাপাপ’!

রফিক মন্ডল, মহেশপুর (ঝিনাইদহ) থেকে ফিরে:

একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক সভ্যতার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েও কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়া যেন এক চরম অপরাধ ও মহাপাপ! আর এই ‘অপরাধে’ ঝিনাইদহের মহেশপুরে যমজ কন্যাসন্তানের জন্ম দেওয়ায় রিনা খাতুন নামের এক ভাগ্য বিড়ম্বিত ও অসহায় গৃহবধূকে নির্মমভাবে তালাক দেওয়ার এক লোমহর্ষক, অমানবিক ও গা শিউরে ওঠা ঘটনা ঘটেছে। শুধু ডিভোর্স বা তালাক দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি পাষণ্ড স্বামী ও তার পরিবার; দেড় মাসের ফুটফুটে দুটি অবুজ কন্যাসন্তানকে বাজারে বিক্রি করে স্ত্রীর দেনমোহর ও কাবিনের টাকা শোধ করার মতো চরম ঘৃণ্য, নিষ্ঠুর ও মধ্যযুগীয় বর্বরতার হুমকিও দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দুই সদ্যোজাত নবজাতককে কোলে নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটছে ভুক্তভোগী মায়ের। তিনি এই অন্যায় ও নির্মম নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কাছে সুষ্ঠু বিচার এবং তাঁর সন্তানদের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার আদায়ের আকুল দাবি জানিয়েছেন।

হৃদয়বিদারক এই ঘটনাটি ঘটেছে ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার কাজিরবের ইউনিয়নের প্রত্যন্ত নতুন কোলা গ্রামে। ভুক্তভোগী রিনা খাতুন পার্শ্ববর্তী পুরাতন কোলা গ্রামের মৃত পীর বক্সের মেয়ে।

পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আনুমানিক দুই বছর আগে নতুন কোলা গ্রামের শহিদুল ইসলামের ছেলে রাকিবুল ইসলামের সঙ্গে রিনা খাতুনের পারিবারিকভাবে অত্যন্ত সাড়ম্বরে বিয়ে হয়। বিয়ের পর প্রথম দিনগুলো বেশ সুখের ও আনন্দময় হলেও, মূল বিপত্তি ঘটে রিনা গর্ভধারণ করার পর। গর্ভধারণের ছয় মাস পূর্ণ হলে চিকিৎসকের পরামর্শে রিনার একটি নিয়মিত আল্ট্রাসনোগ্রাফি করা হয়। উক্ত মেডিকেল রিপোর্টে যখন জানা যায় যে রিনার গর্ভের সন্তান দুটিই ‘কন্যা’, ঠিক তখন থেকেই রিনার জীবনে নেমে আসে অন্ধকারের কালো ছায়া। স্বামী রাকিবুল ও তার পরিবারের সদস্যরা কন্যাসন্তানের খবর কোনোভাবেই মেনে নিতে না পেরে রিনার ওপর শুরু করে তীব্র মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। একপর্যায়ে পাষণ্ডদের অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বাধ্য হয়ে নিজের গর্ভস্থ সন্তান ও নিজের জীবন বাঁচাতে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন রিনা। এরপর থেকে স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির কেউ তাঁর কোনো খোঁজখবর বা চিকিৎসার দায়িত্ব নেয়নি।

পরবর্তীতে বাবার বাড়িতেই ডাক্তারের সাহায্যে অস্ত্রোপচারের (সিজার) মাধ্যমে দুটি ফুটফুটে ও সুস্থ কন্যাসন্তানের জন্ম দেন রিনা। বর্তমানে এই নিষ্পাপ শিশুদের বয়স দেড় মাস পার হয়ে গেলেও পাষণ্ড পিতা রাকিবুল বা তার পরিবারের কেউ সন্তানদের একবারের জন্যও দেখতে আসেনি এবং তাদের কোনো ভরণপোষণের দায়িত্বও নেয়নি।

ভুক্তভোগী মাতা রিনা খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বুকফাটা আর্তনাদ করে বলেন, “এই যুগে কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়া নাকি আমার সবচেয়ে বড় অপরাধ। এই অজুহাতে আমাকে অমানুষিক পিটিয়ে শেষ পর্যন্ত তালাকনামা পাঠানো হয়েছে। এখন আমার স্বামী অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে বলছে, বাচ্চাদের বাজারে বিক্রি করে নাকি আমার কাবিননামার টাকা শোধ করবে! আমি এই জানোয়ারদের উপযুক্ত বিচার চাই।”

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই অমানবিক ঘটনাটি এলাকায় জানাজানি হলে সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বিষয়টি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক হওয়ায় স্থানীয় মাতব্বর ও জনপ্রতিধিরা মীমাংসার উদ্দেশ্যে দুই দফায় বড় সালিশ-বৈঠকের আয়োজন করেন। কিন্তু কন্যাসন্তান ও স্ত্রীকে ঘরে তুলতে সাফ অস্বীকৃতি জানায় স্বামী রাকিবুল ও তার পরিবার। সর্বশেষ সমস্ত সামাজিক রীতিনীতি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রাকিবুল রিনাকে ডাকযোগে ডিভোর্স লেটার (তালাকনামা) পাঠিয়ে দেয়। স্থানীয় ইউপি সদস্য নুহু ঘটনার সত্যতা শতভাগ স্বীকার করে বলেন, “আমরা স্থানীয়ভাবে দুইবার সালিশে বসেছিলাম। কিন্তু রাকিবুল ও তার পরিবার কোনোভাবেই মেয়ে সন্তানদের এবং রিনাকে মেনে নিতে রাজি হয়নি, যার কারণে কোনো সুষ্ঠু সমাধান করা সম্ভব হয়নি।”

এ বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য নেওয়ার জন্য নতুন কোলা গ্রামে রাকিবুল ইসলামের বাড়িতে সরেজমিনে যোগাযোগ করা হলে ঘরের মূল ফটকে তালা ঝুলতে দেখা যায়। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি করার পর এবং প্রশাসনের তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপের বিষয়টি টের পেয়েই অভিযুক্ত স্বামী রাকিবুল ও তার বাবা শহিদুল ইসলাম বাড়ি ছেড়ে অজ্ঞাত স্থানে পালিয়ে গেছেন বলে প্রতিবেশীরা নিশ্চিত করেছেন।

এই বর্বরোচিত ঘটনার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে মহেশপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাজ্জাদ হোসেন এই ঘটনাকে বর্তমান যুগের সামাজিক অবক্ষয়ের এক চরম ও কুৎসিত বহিঃপ্রকাশ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং হৃদয়বিদারক। এ বিষয়ে আমরা ইতোমধ্যে ভুক্তভোগী নারীর পক্ষ থেকে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করে অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” এদিকে কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়া কোনো অপরাধ নয় উল্লেখ করে এই আধুনিক যুগেও যারা এমন মধ্যযুগীয় নোংরা মানসিকতা লালন করে এবং সদ্যোজাত শিশুদের বিক্রির হুমকি দেয়, তাদের দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। ছবি সংগৃহীত।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *