বিশ্বাস শিহাব পারভেজ মিঠু, কলাপাড়া (পটুয়াখালী) :
ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক অপূর্ব সমন্বয়ে উপকূলীয় অঞ্চল পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় আলো ছড়াচ্ছে ‘মঙ্গল সুখ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। বর্তমান সরকারের নতুন শিক্ষাক্রমের সাফল্যের বার্তা ছড়িয়ে প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা কার্যক্রমে এই বিদ্যালয়টি এখন দক্ষিণাঞ্চলের আধুনিক প্রাথমিক শিক্ষার এক অনন্য বাতিঘর। আধুনিক অবকাঠামো, দৃষ্টিনন্দন পরিবেশ আর তথ্য-প্রযুক্তির মেলবন্ধনে এখানে প্রতিদিন চলছে খুদে শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন বোনার কাজ।
কলাপাড়া পৌরশহরে অবস্থিত এই বিদ্যাপীঠে প্রবেশ করলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। বিদ্যালয়ের দেওয়ালে দেওয়ালে আঁকা রয়েছে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস, বীর শহীদ ও শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতিকৃতি। পাশেই শিশুদের প্রিয় চরিত্র ‘মীনা-রাজু’র কার্টুন। প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিকক্ষে রয়েছে শিশুদের নানান খেলার সামগ্রী—স্লিপার, দোলনা, ঘোড়া, হাতি, সিংহ, জিরাফসহ হরেক রকম জীবজন্তুর ডামি। পুরো প্রথম শ্রেণির পাঠ্যবইটিই যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে শ্রেণিকক্ষের দেওয়ালে।
বিদ্যালয়ের প্রাত্যহিক সমাবেশ ও সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের পর ঘণ্টা বাজতেই সুশৃঙ্খলভাবে নিজ নিজ ক্লাসে ছুটে যায় ৭৬৮ জন শিক্ষার্থী। ৩য় শ্রেণির বিজ্ঞান ক্লাসে গিয়ে দেখা গেল এক চমৎকার দৃশ্য। শিক্ষক প্রজেক্টরের মাধ্যমে সাদা পর্দায় প্রাথমিক বিজ্ঞানের ১০ম অধ্যায়ের ‘প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয়’ বিষয়ের একটি আকর্ষণীয় ভিডিও প্রদর্শন করছেন। ভিডিও শেষে চলছে দলগত আলোচনা এবং ল্যাপটপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন। এই ডিজিটাল পদ্ধতিতে পড়ালেখা এখন মুখস্থবিদ্যার গণ্ডি পেরিয়ে শিশুদের জন্য হয়ে উঠেছে আনন্দের।
উন্নত ও আধুনিক শিক্ষাদানের অনন্য স্বীকৃতিস্বরূপ বিদ্যালয়টি ২০২৪ এবং চলমান ২০২৬ সালে বিভাগীয় পর্যায়ে ‘শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয়’ হিসেবে প্রথম স্থান অর্জন করেছে। সরকারের ভিত্তিমূলক শিখন বা এফএলএন (FLN) কার্যক্রম বাস্তবায়নেও এই স্কুলের সাফল্য চোখে পড়ার মতো। গত তিন বছরে শিক্ষার্থীদের ভাষা ও গণিত দক্ষতায় ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বাংলা বিষয়ে শতভাগ এবং তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা গণিত বিষয়ে ৯৫% দক্ষতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম আধুনিকায়নের লক্ষ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় দেশজুড়ে যে তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে প্রথম ধাপে বিশেষভাবে অন্তর্ভুক্ত করেছিল, কলাপাড়ার ‘মঙ্গল সুখ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ তার অন্যতম। (অন্য দুটি হলো পাবনার ভাঙ্গুড়া বোয়ালমারী ও গাজীপুরের উত্তর দরিয়াপুর স্কুল)।
শুধু পড়াশোনাতেই নয়, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও কাব স্কাউটে এই স্কুলের রেকর্ড ঈর্ষণীয়। ২০২২ সালে শতভাগ বৃত্তি লাভ এবং ২০২৩ সালে ‘অল বাংলাদেশ’ প্রতিযোগিতায় প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে স্কুলটি। সম্প্রতি ২০২৬ সালের বিভাগীয় ‘বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে’ কলাপাড়ার এই বিদ্যালয়টি তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে, যা পুরো পটুয়াখালী জেলার মধ্যে প্রথম।
সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছে এই স্কুলের ‘কাব স্কাউট’ দল। বিগত ১০ বছরে শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ডসহ মোট ১০৪টি জাতীয় স্তরের পুরস্কার নিজেদের ঝুলিতে পুরেছে তারা। শুধু বিগত ৫ বছরেই তারা অর্জন করেছে রেকর্ড ১২২টি শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ড। সাধারণ জ্ঞান বিকাশের জন্য রয়েছে সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার এবং বিনোদনের জন্য পিয়ানো, হারমোনিয়ামসহ আধুনিক বাদ্যযন্ত্র।
বিদ্যালয়ের এই গৌরবময় পথচলা নিয়ে প্রধান শিক্ষক নাজমুস সাকিব খান কনা বলেন, “১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়টি ১৯৯৫ সালে ‘আদর্শ বিদ্যালয়’ এবং ২০০৫ সালে ‘মডেল বিদ্যালয়’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। বর্তমানে প্রধান শিক্ষকসহ ১৬ জন দক্ষ শিক্ষক আমাদের ৩৪৫ জন বালক ও ৪২৩ জন বালিকার ভিত্তিমূলক শিখন নিশ্চিত করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন। অভিভাবক ও প্রশাসনের সহযোগিতায় আমরা এই সাফল্যের ধারা ভবিষ্যতেও ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর।”
কলাপাড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোসা. শাহিদা বেগম বলেন, “FLN কার্যক্রমসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে কলাপাড়ার মঙ্গল সুখ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সফলতার স্বাক্ষর রেখে চলেছে। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, এই বিদ্যালয়ের হাত ধরেই সরকারের আধুনিক শিক্ষা কার্যক্রমের অভীষ্ট লক্ষ্য সফল হবে।”
উপকূলীয় অঞ্চলের এই সফল বিদ্যাপীঠটি বর্তমানে পটুয়াখালী তথা সমগ্র বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি অনুকরণীয় ও অনুপ্রেরণাদায়ী মডেল। ছবি সংগৃহীত।

