স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
দরিদ্র, নিঃস্ব ও সমাজ থেকে পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক নারীদের অর্থনৈতিক সুরক্ষায় সরকারের অগ্রাধিকার ভিত্তিক ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রকল্পে যশোরে এক নজিরবিহীন জালিয়াতি ও জঘন্য অনিয়মের ঘটনা উন্মোচিত হয়েছে. শর্ত অনুযায়ী যাদের নিজস্ব কোনো মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, জমি নেই, যারা বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা কিংবা পরিবারে প্রতিবন্ধী সদস্য রয়েছে—কেবলমাত্র সেই নারীদেরই এই প্রকল্পের প্রধান উপকারভোগী করার আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল। অথচ সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের চরম গাফিলতি ও অস্বচ্ছতায় যশোরের চাঁচড়া ইউনিয়নে প্রস্তুতকৃত তালিকায় অন্তত ৬২ জন চরম বিত্তশালী ও ধনী পরিবারের নারীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যার মধ্যে ৫ তলা বিশিষ্ট আলিশান বহুতল ভবনের মালিকের স্ত্রীও রয়েছেন! সরকারের পবিত্র একটি মানবিক প্রকল্পে এমন ভয়াবহ ঘাপলা ও অসংগতি হাতেনাতে ধরা পড়ার পর গতকাল বুধবার (৩ জুন, ২০২৬) রাতে তড়িৎ ও নজিরবিহীন কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। এই চরম জালিয়াতি ও মনিটরিংয়ে গাফিলতির অপরাধে একই দিনে, একযোগে যশোর জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক হারুন অর রশীদসহ দুই সহকারী পরিচালক সাইফুল ইসলাম ও ইতি দত্ত সেনকে তাৎক্ষণিকভাবে চাকরি থেকে ‘স্ট্যান্ড রিলিজ’ বা শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে।


মন্ত্রণালয় সূত্র ও প্রকাশিত সরকারি আদেশে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখার উপসচিব রবিউল ইসলাম জনস্বার্থে এই কঠোর বদলির আদেশ জারি করেছেন। আদেশে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত উপপরিচালক হারুন অর রশীদকে দূরবর্তী জেলা জয়পুরহাটে, সহকারী পরিচালক সাইফুল ইসলামকে পাবনায় এবং নারী সহকারী পরিচালক ইতি দত্ত সেনকে গোপালগঞ্জে স্ট্যান্ড রিলিজের মাধ্যমে অবমুক্ত করা হয়েছে। একই সাথে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া ওই ৬২ জন ধনী নারীর ফ্যামিলি কার্ড ও তাঁদের নামে বরাদ্দকৃত রাষ্ট্রীয় অর্থ পুরোপুরি স্থগিত ঘোষণা করেছে মন্ত্রণালয়। মূলত, বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ অগ্রাধিকার ভিত্তিক ফ্যামিলি কার্ড পাইলট প্রকল্পের আওতায় যশোর সদর উপজেলার পিছিয়ে পড়া চাঁচড়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে দারিদ্র্য জরিপ চালিয়ে মোট ২০৪২ জন নারীকে এই সুবিধার আওতায় আনা হয়েছিল। গত ১৬ মে ভাতুড়িয়া স্কুল মাঠে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বয়ং ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে একযোগে এই কর্মসূচির দ্বিতীয় পর্যায়ের উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের পরপরই ১ হাজার ৯শ’ ৮০ জন প্রকৃত দরিদ্র নারীর মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে সরাসরি ২ হাজার ৫০০ টাকা করে অর্থ সহায়তা পৌঁছে গেলেও চরম জালিয়াতির কারণে ওই ৬২ জন ধনী নারীর টাকা মাঝপথেই আটকে দেওয়া হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সমাজসেবা অধিদপ্তর যশোরের মোট ৫৪ জন মাঠপর্যায়ের সমাজকর্মী দীর্ঘ জরিপ চালিয়ে এই ত্রুটিপূর্ণ তালিকা প্রস্তুত করেছিলেন। তবে উদ্বোধনের কয়েকদিন আগেই সচেতন মহলের পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জমা পড়ে যে, তালিকায় আসা নারীদের অনেকেই কোটিপতি এবং বহুতল বাড়ির মালিক, যা সম্পূর্ণ শর্তবিরোধী। এই বিষয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে এবং নিজের দায় এড়ানোর চেষ্টা করে স্ট্যান্ড রিলিজ হওয়া উপপরিচালক হারুন অর রশীদ জানান, মাঠপর্যায়ের ইউনিয়ন সমাজকর্মীরা কাজ করার সময় এই ৬২ জন ধনী নারীর নাম তালিকায় ঢুকিয়ে ফেলেছিল এবং বিষয়টি জানতে পেরে তিনি নিজেই মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়ে টাকা স্থগিতের অনুরোধ করেছিলেন, যদিও শেষ রক্ষা হয়নি। অন্যদিকে, যশোর সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আশিকুজ্জামান তুহিন স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই ফ্যামিলি কার্ডের পাইলট প্রকল্পটি সম্পূর্ণ জেলা কার্যালয় এককভাবে তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং তালিকাও জেলা অফিস থেকেই সরাসরি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল, ফলে এই মারাত্মক কেলেঙ্কারির সাথে উপজেলা কার্যালয়ের কোনো প্রকার দূরতম বা প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা নেই। সরকারি প্রকল্পে এমন ধৃষ্টতা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ের এই তড়িৎ অ্যাকশনকে যশোরের সাধারণ মানুষ স্বাগত জানিয়েছেন।ছবি সংগৃহীত।


