৭ লাখ টাকার প্রকল্প গিলে খেলেন সচিব!

৭ লাখ টাকার প্রকল্প গিলে খেলেন সচিব!

বিশেষ প্রতিনিধি:

যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী পানিসারা ইউনিয়ন পরিষদের বিতর্কিত সচিব ফরহাদ হোসেনের বিরুদ্ধে সরকারি খাল খনন, গ্রামীণ রাস্তা সংস্কার, টিআর, কাবিটা ও কাবিখা কর্মসূচির একাধিক মেগা প্রকল্পে নজিরবিহীন অনিয়ম, চরম স্বেচ্ছাচারিতা এবং লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট ও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় একাধিক ইউপি সদস্য (জনপ্রতিনিধি) ও ভুক্তভোগী বাসিন্দাদের সরাসরি অভিযোগ— বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের সরকারি অর্থ ব্যাংক থেকে উত্তোলন, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ক্রয় এবং ব্যয়ের মূল হিসাব সচিব নিজেই এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছেন। তবে সুকৌশলে এই বিপুল পরিমাণ টাকা পকেটস্থ করার পর, এসব অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি অত্যন্ত চতুরতার সাথে দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট কাজ সম্পর্কে তিনি নাকি ‘কিছুই জানেন না’।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সম্প্রতি পানিসারা ইউনিয়নে সমাপ্ত হওয়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কাবিটা কর্মসূচির আওতায় চাপাতলা গ্রামের দক্ষিণপাড়া দোতলা মসজিদ থেকে শহর আলীর বাড়ি হয়ে হানিফার বাড়ি অভিমুখে রাস্তা সলিংকরণ প্রকল্পে এককালীন ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এছাড়া উপজেলা পরিষদের ইউনিয়ন পরিষদ উন্নয়ন সহায়তা তহবিলের আওতায় চাপাতলার বাবুর দোকান থেকে জাবেরের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা ফ্ল্যাট সলিংকরণে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

একই সাথে কাবিখা-গম কর্মসূচির আওতায় শহিদুলের বাড়ি থেকে ইমামুলের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সলিংকরণ, টিআর কর্মসূচির আওতায় পানিসারা গ্রামের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে মান্নানের জমি থেকে আফিলের জমি পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘শ্বেতগঙ্গা খাল’ উন্নয়ন এবং ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কলাপসিবল গেট ও প্রধান ফটক নির্মাণসহ একাধিক সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে— যার প্রতিটিতেই হরিলুটের ছক এঁকেছেন সচিব।

স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রকাশ্য অভিযোগ, সরকারি অর্থ বরাদ্দ শতভাগ থাকলেও অধিকাংশ প্রকল্পে সিডিউল ও চাহিদা অনুযায়ী বিন্দুমাত্র কাজ হয়নি। খাতা-কলমে শতভাগ দেখিয়ে কোথাও কোথাও প্রকল্পের মাত্র দুই-তৃতীয়াংশ কাজ করেই তড়িঘড়ি করে সমাপ্ত দেখানো হয়েছে। কাজ চলাকালে চোরচক্রের প্রধান হোতা সচিব ফরহাদ হোসেনকে মাত্র একদিন এলাকায় লোকদেখানো তদারকি করতে দেখা গেলেও পরে আর কোনো খোঁজ মেলেনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ইউপি সদস্য ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রকল্পগুলোর ১ নম্বর ইটের বদলে ৩ নম্বর ইট ও লোকাল বালি ক্রয় থেকে শুরু করে ব্যয়ের সমস্ত হিসাব সচিব ফরহাদ হোসেন একাই নিয়ন্ত্রণ করেছেন। তারা কেবল প্রকল্পের কাজ লোকদেখানো তদারকি করেছেন এবং সচিবের চাপে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়েছেন। কাজ শেষে ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব চাইলে সচিব তাদের গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দেন বলে অভিযোগ।

একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের সভাপতি ও সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্য মোছা: জবেদা বেগম গণমাধ্যমের সামনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বিষ্ফোরক তথ্য দিয়ে বলেন, “আমার সরলতার সুযোগ নিয়ে প্রকল্পের লাখ লাখ টাকা আমার ব্যাংক হিসাব থেকে কৌশলে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে উত্তোলন করেছেন সচিব। আমি নিজে কাজ করতে চাইলেও তিনি আমাকে কোনো ক্ষমতা দেননি। তিনি নিজেই অত্যন্ত নিম্নমানের ইট-বালি কিনে দিয়েছেন। আমার কাজের জন্য ১৭ গাড়ি ইট ও ১৯ গাড়ি বালির স্লিপ ছিল, যেখানে মাত্র ১ হাজার ৫৩ ফুট কাজ হয়েছে। কাজ শেষে হিসাব চাইলে তিনি আমাকে কোনো হিসাব দেননি, উল্টো শুধু শ্রমিকদের নাস্তা ও লেবার খরচ বাবদ নামমাত্র ৩৫ হাজার টাকা আমার হাতে গুঁজে দিয়ে মুখ বন্ধ রাখতে বলেন।”

অপরদিকে শ্বেতগঙ্গা খাল উন্নয়ন প্রকল্পের সভাপতি ও ইউপি সদস্য মো: আলীম গাজী নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে বলেন, “সচিব আমাকে বলেছিলেন এটি নাকি উপজেলার অতিরিক্ত একটি বিশেষ প্রকল্প, এলাকার স্বার্থে কাজটি করে দিতে হবে। তাঁর মিষ্টি কথায় বিশ্বাস করে আমি ফাঁদ বুঝতে না পেরে তাঁর সরবরাহ করা খালি চেকে স্বাক্ষর করি। পরে ব্যাংক থেকে লাখ লাখ টাকা তুলে নিয়ে শ্রমিকদের মজুরির জন্য তিনি আমাকে মাত্র ৭৬ হাজার টাকা ছুড়ে দেন। এছাড়া পিআইও অফিসের ঘুষের জন্য নাকি আরও ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে বলে আমাকে জানান। বাকি সিংহভাগ টাকা কোথায় গায়েব হলো, সে বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।”

এদিকে একের পর এক অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে দুর্নীতির এই পাহাড়সম অভিযোগের বিষয়ে জানতে পানিসারা ইউনিয়ন পরিষদের সচিব ফরহাদ হোসেনের মুখোমুখি হওয়া হলে তিনি সমস্ত দায় অস্বীকার করে বলেন, “চাপাতলার কাজ আনোয়ার মেম্বার, সেলিম মেম্বার ও কবির মেম্বার করেছেন। প্রকল্পের রাস্তার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। আমি শুধু একদিন দেখতে গিয়েছিলাম। কত গাড়ি ইট, বালি এবং অন্যান্য খরচ হয়েছে, তা ওই তিন মেম্বারই ভালো বলতে পারবেন।”

তবে সচেতন এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগী জনপ্রতিধিদের জোরালো দাবি, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও উপজেলা প্রশাসন যদি প্রকল্পগুলোর অর্থ উত্তোলন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় সচিবের ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও সরাসরি সম্পৃক্ততার বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে, তবে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে। এই নজিরবিহীন দুর্নীতির ঘটনায় ঝিকরগাছা উপজেলাজুড়ে সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়েছে। ছবি সংগৃহীত।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *