স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং মানিলন্ডারিং (অর্থ পাচার) আইনের মামলায় দীর্ঘ বছর পলাতক থাকার পর অবশেষে আইনের খাঁচায় বন্দি হয়েছেন এক সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ও তাঁর সহধর্মিণী। যশোর আদালতে সশরীরে আত্মসমর্পণ করে জামিনের সওয়াল-জবাব করলেও বিজ্ঞ বিচারক তাঁদের আবেদন এক বাক্যে নামঞ্জুর করে সরাসরি জেলা কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। আজ বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) দুপুরের দিকে যশোরের বিশেষ দায়রা জজ আদালতের বিজ্ঞ বিচারক এস. এম. নূরুল ইসলাম এই আদেশ প্রদান করেন।
যশোর স্পেশাল জজ আদালত ও দুদক সূত্রে জানা গেছে, দুর্নীতি ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অভিযুক্ত এই দুই আসামি হলেন— বাংলাদেশ পুলিশের চাকরিচ্যুত সাবেক অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টর (ASI) জসিম উদ্দিন এবং তাঁর স্ত্রী ফারহানা ইসলাম।
মামলার নথির বিবরণ ও চার্জশিট অনুযায়ী, এএসআই জসিম উদ্দিন পুলিশ বাহিনীতে কর্মরত থাকাকালীন নিজের পদ ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে সম্পূর্ণ অবৈধ উপায়ে ও উৎসের বাইরে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করেন। পরবর্তীতে সেই কালো টাকা সাদা করতে তিনি নিজের এবং স্ত্রীর নামে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির পাহাড় গড়ে তোলেন। দুদকের নিবিড় অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে যে, জসিম উদ্দিন ও তাঁর স্ত্রী ফারহানা ইসলাম দম্পতি তাঁদের বৈধ আয়ের উৎসের সম্পূর্ণ বাইরে গিয়ে ১ কোটি ৩৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অবৈধ সম্পদ অর্জন ও মানিলন্ডারিং করেছেন। এই সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগে বিগত ২০২০ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, যশোর-এর পক্ষ থেকে তাদের বিরুদ্ধে একটি নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়।
মামলা দায়েরের পর দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তা দীর্ঘ তদন্ত শেষে আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের অভিযোগের সত্যতা পান। সেই ধারাবাহিকতায় বিগত ২০২১ সালে জসিম ও তাঁর স্ত্রী ফারহানাকে অভিযুক্ত করে বিজ্ঞ আদালতে চূড়ান্ত চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করা হয়।
আদালতে চার্জশিট দাখিলের পর গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলে সাবেক এই এএসআই ও তাঁর স্ত্রী দীর্ঘ প্রায় ৫-৬ বছর ধরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে ছদ্মবেশে পলাতক জীবনযাপন করছিলেন। অবশেষে আজ বৃহস্পতিবার সকালে আর কোনো আইনি পথ খোলা না থাকায় তাঁরা যশোর বিশেষ দায়রা জজ আদালতে এসে জামিন প্রার্থনার শর্তে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেন।
আদালতে আত্মসমর্পণ করার পর আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাঁদের বয়স এবং সামাজিক মর্যাদার দোহাই দিয়ে জামিনের পক্ষে জোর সওয়াল করেন। অপরদিকে, রাষ্ট্রপক্ষ ও দুদকের প্যানেল আইনজীবী এই কোটি টাকার দুর্নীতি ও মানিলন্ডারিং মামলার তীব্র বিরোধিতা করে আসামিদের জামিন নামঞ্জুর করে জেলহাজতে পাঠানোর জোর দাবি জানান। উভয় পক্ষের দীর্ঘ শুনানি ও যুক্তি-তর্ক পর্যালোচনা শেষে বিশেষ দায়রা জজ এস. এম. নূরুল ইসলাম সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন ও তাঁর স্ত্রী ফারহানা ইসলামের জামিন আবেদন সুনির্দিষ্টভাবে নাকচ করে দেন এবং তাঁদের কড়া পুলিশি পাহারায় যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
আদালতের এই কড়া নির্দেশের পর পরই সাবেক সহকর্মীরাই হাতকড়া পরিয়ে প্রিজন ভ্যানে করে জসিম ও তাঁর স্ত্রীকে আদালতের গারদখানা থেকে কেন্দ্রীয় কারাগারের উদ্দেশ্যে নিয়ে যান। একজন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তার কোটি টাকার দুর্নীতির জেরে এমন সস্ত্রীক পতনের ঘটনায় আজ আদালত পাড়ায় দিনভর ব্যাপক চাঞ্চল্য ও গুঞ্জনের সৃষ্টি হয়। ছবি সংগৃহীত।

