স্ত্রী-সন্তান ও সাজানো সংসার ফেলে না ফেরার দেশে সাকিন: সহকর্মীর চোখে এক ঝরঝরে তরুণের অকাল বিদায়

স্ত্রী-সন্তান ও সাজানো সংসার ফেলে না ফেরার দেশে সাকিন: সহকর্মীর চোখে এক ঝরঝরে তরুণের অকাল বিদায়

ছাকিন হাসান দুরন্ত—নামটার মতোই টগবগে, প্রাণোচ্ছ্বল এক তরুণ যুবক। পেছনে রেখে গেছেন তার সাজানো সংসার, স্ত্রী আর এক আদরের সন্তান। জীবনে ক্ষমতা, পরিচিতি আর ভালো কিছু করার প্রবল স্বপ্ন ছিল তার বুকে। সেই সুযোগও এসেছিল। ঐতিহ্যবাহী ‘দৈনিক সুবর্ণভূমি’ পত্রিকার হাত ধরেই সাংবাদিকতার জগতে তার পথচলা শুরু হয়। পেশাগত দক্ষতার কারণে খুব দ্রুতই সে বহু মানুষের পরিচিতি ও ভালোবাসা লাভ করে। এতে তার কাজের গতি ও আগ্রহ আরও বেড়ে যায়, আরও দীপ্ত মনে সুবর্ণভূমিতে কাজ শুরু করে সে।

আমাদের সম্পর্কটা ছিল অদ্ভুত সুন্দর আর আত্মিক বন্ধনে জড়ানো। পত্রিকার ডেস্কে সে আমাকে সবসময় ‘বড় ভাই’ বলেই ডাকত। তবে কাজের তাগিদে বা কিছু ব্যক্তিগত বিষয়ের কারণে প্রায়ই আমার সাথে তার সামান্য মনোমালিন্য হতো। কিন্তু ছেলেটা এমনই ছিল যে, নিজের ভুল বুঝতে পেরে পরক্ষণেই আমার কাছে এসে ক্ষমা চাইত। আমি তাকে স্নেহের সুরে বলতাম, “ক্ষমা চাওয়ার কিছু নেই ছাকিন, বড় ভাই হিসেবে তোমার ভুল সংশোধন করে দেওয়াটাই আমার কর্তব্য।” এভাবেই প্রিন্ট আর মাল্টিমিডিয়া নিউজের কাজ নিয়ে চমৎকার কেটে যাচ্ছিল আমাদের দিনগুলো।

গত মঙ্গলবার (১৪ জুলাই ২০২৬) সন্ধ্যার কথাটি আজ বারবার মনে পড়ছে। সেদিন ছাকিন অফিসে এসেছিল লাল শার্ট আর কালো প্যান্ট ইন করে, একদম সুসজ্জিত ও পরিপাটি হয়ে। দীর্ঘ দুই মাস পর তাকে এতটা গোছানো ও প্রফুল্ল দেখে আমি প্রশংসার সুরে বলেছিলাম, “খুব সুন্দর লাগছে ছাকিন!” সে একগাল হেসে আনন্দের সাথে উত্তর দিয়েছিল, “ভাই, এবার থেকে আমাকে এভাবেই পরিপাটি দেখবেন। সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে, আর কখনো আমাকে উশৃঙ্খল দেখবেন না।”

কে জানত, পরিপাটি হয়ে আসার আড়ালে সে আসলে চিরবিদায়ের নিঃশব্দ প্রস্তুতি নিচ্ছিল! এর ঠিক একদিন পরেই বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই ২০২৬) পারিবারিক বিশেষ কাজে আমি অফিস থেকে ছুটি নিই। সেদিন রাত ৮টার দিকে হঠাৎ একটা ফোন কলে আমার পৃথিবীটা স্তব্ধ হয়ে গেল। ওপাশ থেকে খবর এলো—ছাকিন আত্মহত্যা করেছে! তার মরদেহ এখন হাসপাতালের মর্গে। কিছুক্ষণের জন্য আমি পুরোপুরি বাকরুদ্ধ ও নিথর হয়ে রইলাম।

পেশাগত কারণে যশোর থেকে কিছুটা দূরে থাকায় শেষবারের মতো ছাকিনের জানাজায় উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য আমার হয়নি। কিন্তু সাংবাদিকতার নিষ্ঠুর দায়বদ্ধতা আমাকে ঠিকই আঁকড়ে ধরল। দূর থেকেই ছাকিনের আত্মহত্যার প্রকৃত কারণ জানতে তার বন্ধুদের ফোন দিলাম, কথা বললাম পরিবারের সদস্যদের সাথে। হাসপাতাল ও পুলিশের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে শেষ পর্যন্ত আমাকেই অত্যন্ত ভারী মন নিয়ে তার অকাল মৃত্যুর নিউজটি তৈরি করতে হলো।

নিউজটি লেখার সময় প্রতিটি অক্ষরে ছাকিনের সেই চেনা হাসিমুখ, তার লাল শার্ট পরা অবয়ব আমার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল। চোখের কোণে জল না থাকলেও, এক বুক চাপা কষ্ট আর ব্যথিত মন নিয়ে নিউজটি শেষ করে অফিসের ইমেইলে পাঠিয়ে দিলাম।

সাংবাদিক ছাকিন হয়তো জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ভালোবাসা আর সুখের পেছনে ছুটেছিলেন, কিন্তু নির্মম বাস্তবতার চোরাবালিতে তাকে হেরে যেতে হলো। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, তিনি যেন ছাকিনের সব ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দেন এবং তার ভালো কাজগুলোর উসিলায় তাকে জান্নাতবাসী করেন।

আমিন।

সৈয়দ শাহ মোস্তাফা হাসমী,

স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক সুবর্ণভূমি, যশোর।

আরো পড়ুন

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *