শিক্ষাগুরুর মুখোশে  ‘অ্যাকশন ডিরেক্টর’!
Conceptual cartoon of a monster teacher in school

শিক্ষাগুরুর মুখোশে ‘অ্যাকশন ডিরেক্টর’!

স্ফুলিঙ্গ  রিপোর্ট :

যাঁদের হাত ধরে কোমলমতি শিশুরা আদর্শ মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখে, তাঁরা নাকি মানুষ গড়েন। কিন্তু যশোর সদর উপজেলার দত্তপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল জব্বার এই আদিম থিউরিতে বিশ্বাসী নন। তিনি মানুষ গড়েন না, মানুষ ‘পেটান’! তাঁর ডিকশনারিতে লাথি, চড়, কিল, ঘুসি কিংবা গলাধাক্কা—কোনো শব্দই বাদ নেই। আপাতদৃষ্টিতে তাঁকে কোনো পাড়ার সন্ত্রাসী বা মাস্তান ভাবলে ভুল করবেন, তিনি খোদ একটি সরকারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক! ভুক্তভোগীদের দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস বলছে, শিক্ষকতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই ‘অ্যাকশন ডিরেক্টর’-এর হাতে ইতোমধ্যে অন্তত ৬ থেকে ৭ জন ব্যক্তি গণধোলাইয়ের স্বাদ গ্রহণ করেছেন। মজার ব্যাপার হলো, তদন্তে দোষী প্রমাণিত হয়ে শাস্তি পাওয়ার পরও তাঁর এই মারকুটে পারফরম্যান্সের গ্রাফ একদমই নিচের দিকে নামেনি।

সর্বশেষ রোমহর্ষক প্রদর্শনীটি মঞ্চস্থ হয়েছে গত ১৮ মে। কোনো আড়াল-আবডাল নয়, একেবারে বিদ্যালয়ের সাধারণ অভিভাবকদের সামনেই এক সহকারী শিক্ষিকাকে প্রকাশ্য দিবালোকে পিটিয়ে নিজের ‘পুরুষত্ব’ জাহির করেছেন এই প্রধান শিক্ষক। একজন নারী শিক্ষকের গায়ে হাত তোলার এই ‘দুর্দান্ত’ দৃশ্য দেখে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা থ বনে গেলেও, শিক্ষা প্রশাসনের ঘুম ভাঙেনি। ঘটনার দুই দিন পর, অর্থাৎ ২০ মে ভুক্তভোগী শিক্ষিকা সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসারের কাছে লিখিত নালিশ ঠুকে দেন। নালিশের কপি জেলা অফিস থেকে শুরু করে খুলনা বিভাগীয় উপপরিচালক হয়ে ঢাকার প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর পর্যন্ত ভ্রমণ করেছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এক মাসেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকের চেয়ারে একটা আঁচড়ও লাগেনি। উপজেলা শিক্ষা অফিস যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, তার গতি দেখলে কচ্ছপও লজ্জা পাবে! স্থানীয়দের মুখে এখন একটাই প্রশ্ন— কী এমন জাদুর কাঠি আছে এই জব্বারের হাতে, যার জোরে প্রতিবারই তিনি পার পেয়ে যান?

আব্দুল জব্বারের ‘মারপিটের ইতিহাস’ অবশ্য বেশ সমৃদ্ধ ও গৌরবোজ্জ্বল। ২০২৩ সালে তিনি যশোর জেলা হিসাবরক্ষণ অফিসে ঢুকে প্রধান শিক্ষক আতিকুর রহমানকে এবং একই বছর উপজেলা শিক্ষা অফিসে গিয়ে প্রধান শিক্ষক আজিজুর রহমানকে প্রকাশ্য অপদস্থ ও লাঞ্ছিত করার ‘ডাবল সেঞ্চুরি’ পূর্ণ করেন। ওই বছরই আবার দত্তপাড়া স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির এক চিলতে শিশু ফাতেমা তুজ জোহরাকে এমন শিক্ষা দিয়েছিলেন যে, তাকে সোজা যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের বেডে গিয়ে উঠতে হয়েছিল। সেবারও তদন্ত কমিটি হয়েছিল, কিন্তু তৎকালীন ‘রাজনৈতিক শক্তির’ বাতাসে সেই তদন্তের খাতা কোথায় উড়ে গেল, তা আর কেউ বলতে পারে না।

একটু পেছনে ফিরে ২০২২ সালের দিকে তাকালে দেখা যাবে, সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসের নারী অফিস সহকারী রেক্সোনার চেয়ারে লাথি মেরে নিজের ক্ষমতার জানান দিয়েছিলেন এই বীর পুরুষ। সরকারি কর্মকর্তাদের সামনেই ঘটেছিল সেই ধুন্ধুমার কাণ্ড। পরে অবশ্য বিভাগীয় মামলায় তাঁর দুটি ইনক্রিমেন্ট কাটা যায়, ব্যস—ঐটুকুই!

শুধু গায়ের জোর নয়, জব্বার সাহেবের হাতের যশ আর্থিক দিকেও সমান সচল। ২০২১ সালে চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রের উপবৃত্তির টাকা পকেটস্থ করতে তিনি যে ডিজিটাল জালিয়াতি দেখিয়েছেন, তা হলিউডের চোরেরাও পারবে না। ছাত্রের নিজের মায়ের নাম কেটে সেখানে জুড়ে দিয়েছিলেন নিজের সহধর্মিণীর নাম! এরপর খুব সুন্দর করে টাকাটা তুলে ঘরে নিয়ে যান। পরবর্তীতে শিক্ষা অধিদপ্তরের তাড়া খেয়ে অবশ্য টাকাটা ফেরত দিয়ে ‘সততার’ প্রমাণ দেন। স্লিপের টাকা আর স্কুলের ক্ষুদ্র মেরামতের অর্থ কীভাবে গায়েব করতে হয়, সেই বিদ্যাতেও তিনি পিএইচডিধারী।

স্থানীয় সূত্র হাসতে হাসতে জানায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদারের ডানহাত হিসেবে পরিচিত ছিলেন এই আব্দুল জব্বার। সেই ‘চাকলাদার’ ক্ষমতার গরমে তিনি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে সবাইকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলতেন। তাঁর ভয়ে এতদিন কেউ প্রকাশ্যে টু শব্দ করার সাহস পায়নি।

তবে নিজেকে ধোয়া তুলসী পাতা দাবি করে প্রধান শিক্ষক আব্দুল জব্বার এক গাল হেসে বলেন, “আরে ভাই, ওই শিক্ষিকা ঠিকমতো স্কুলে আসেন না, দাঁড়িয়ে ক্লাস নেন না, তাই একটু প্রেমলাপ… থুড়ি, কথা কাটাকাটি হয়েছে মাত্র।” আর নারী শিক্ষকের গায়ে হাত তোলার কথা জিজ্ঞেস করতেই তাঁর ভেতরের সুপ্ত গুন্ডাটি আবার জেগে ওঠে। খেঁকিয়ে উঠে সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, “আপনি কি দেখেছেন? আমিও এককালে সাংবাদিক ছিলাম। আপনি কিসের সাংবাদিক, সেটা আমি দেখে নেব!”

এদিকে, এই ‘মহিমান্বিত’ প্রধান শিক্ষকের বিষয়ে জানতে যশোর সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার হাবিবুর রহমানের ব্যক্তিগত মোবাইলে একাধিকবার রিং করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। বোধহয় তিনিও জব্বার সাহেবের ‘কিল-ঘুসি’র ভয়ে ফোনটা দূরে সরিয়ে রেখেছেন! দত্তপাড়ার সচেতন মহলের এখন একটাই আকুতি—স্কুলটাকে আর কুস্তির আখড়া না বানিয়ে এই ‘ওস্তাদ’ আব্দুল জব্বারকে যেন দ্রুত কোনো কুস্তি ফেডারেশনে বদলি করা হয়! কার্টুনটি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *