রাজপথ, রণাঙ্গন ও সংস্কৃতির অগ্রনায়ক অ্যাডভোকেট রবিউল আলমের জন্মতিথি আজ

রাজপথ, রণাঙ্গন ও সংস্কৃতির অগ্রনায়ক অ্যাডভোকেট রবিউল আলমের জন্মতিথি আজ

স্ফুলিঙ্গ  রিপোর্ট :

কিছু মানুষ জন্ম নেন ইতিহাস গড়বার জন্য, যুগের পর যুগ ধরে একটি সমাজ বা জনপদকে আলোর পথ দেখাবার জন্য। বৃহত্তর যশোরের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আঙিনায় তেমনই এক দীপ্তিময় নক্ষত্র ও জীবন্ত বাতিঘরের নাম অ্যাডভোকেট রবিউল আলম। আজ ২ জুনের এই বিশেষ লগ্নে তিনি জীবনের গৌরবোজ্জ্বল ৭৬টি বছর সফলভাবে পেরিয়ে পা রাখলেন সাতাত্তরের অনন্য চৌকাঠে। ১৯৫০ সালের আজকের এই দিনে যশোর শহরের লোন অফিস পাড়ার এক সাধারণ ভাড়া বাড়িতে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি আজ আর কেবল কোনো ব্যক্তি নন, বরং তিনি নিজেই এক অবিনশ্বর প্রতিষ্ঠান এবং যশোর জেলার এক জীবন্ত ইতিহাস। পিতা মরহুম ইসহাক সরদার এবং মাতা মোমেনা খাতুনের বড় ছেলে রবিউল আলমের জীবনের সিংহভাগ গল্পটাই কেটেছে ঘোপ পিলু খান সড়কের সেই চেনা পৈত্রিক বাড়িকে কেন্দ্র করে, যা আজ বহু আন্দোলন, সংগ্রাম আর স্বপ্নের এক নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

শিক্ষাজীবনে সম্মিলনী ইনস্টিটিউশন থেকে শুরু করে এমএম কলেজ, সিটি কলেজ এবং শহীদ মশিউর রহমান ল’ কলেজের মাটি ও আলোয় বড় হওয়া রবিউল আলম যৌবনের শুরুতেই নিজের জীবনকে সঁপে দিয়েছিলেন রাজপথের উত্তাল আন্দোলনে। স্কুল কমিটির সাধারণ সম্পাদক থেকে ১৯৭০ সালে জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে যখন তিনি দায়িত্ব পালন করছিলেন, তখনই তাঁর ধমনীতে জ্বলছিল দেশমাতৃকাকে স্বাধীন করার সুপ্ত আগুন। ১৯৬৮ সালে সম্পূর্ণ গোপনে গড়ে ওঠা ‘স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াস’-এর সাথে যুক্ত হওয়া এবং ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অগ্রনায়ক হিসেবে রাজপথ কাঁপানো—সবই ছিল তাঁর জীবনের এক একটি অগ্নিপরীক্ষা। ১৯৭১ সালের অগ্নিঝরা মার্চে যখন পাকিস্তানি হানাদাররা এদেশের বুকে গণহত্যা শুরু করে, তখন মাত্র ২১ বছরের এই লড়াকু যুবক ভারতের উত্তরপ্রদেশের দেরাদুনের টান্ডুয়া সামরিক ক্যাম্পে গিয়ে অত্যন্ত কঠিন গেরিলা প্রশিক্ষণ নেন। দেশে ফিরে তিনি তৎকালীন বৃহত্তর যশোর অঞ্চলের (যশোর, নড়াইল, ঝিনাইদহ ও মাগুরা) মুজিব বাহিনীর উপপ্রধান হিসেবে সম্মুখ সমরের নেতৃত্ব দেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর অকুতোভয় রণকৌশলের কারণে সহযোদ্ধা ও শত্রুপক্ষ সকলের কাছে তিনি পরিচিতি পান বীর ‘গাজী’ নামে, যাঁর হুংকারে তৎকালীন শত্রুশিবির কেঁপে উঠত।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কঠিন আবর্তে পড়ে দুই মেয়াদে দীর্ঘ ৫ বছর তাঁকে কারাবরণ করতে হলেও তিনি দমে যাননি। ১৯৮৫ সালে জেল থেকে মুক্ত হয়েই তিনি বিপুল জনসমর্থন নিয়ে যশোর সদর উপজেলা পরিষদের প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং অনন্য জনসেবার নজির স্থাপন করেন। ১৯৭২ সালে জাসদ প্রতিষ্ঠার অন্যতম এই কারিগর দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে জাসদের সভাপতি হিসেবে যশোরের প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির হাল ধরে আছেন। শুধু রাজনৈতিক রাজপথেই নয়, সংস্কৃতির ছোঁয়ায় একটি সুন্দর ও মানবিক সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে তিনি যশোর ইনস্টিটিউট, উদীচী, চাঁদের হাট, তীর্থক ও সুরধুনীর মতো শীর্ষস্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনের অভিভাবক হিসেবে কাজ করে চলেছেন। ফ্রান্স, স্পেন, গ্রিস, চীন কিংবা নেপালের মতো বিশ্বের বহু দেশ ভ্রমণের সুযোগ হলেও এই স্পষ্টভাষী বীরের মন সবসময় পড়ে থাকে যশোরের সাধারণ মানুষের মাঝে।

এই চিরসবুজ ও অপরাজেয় বীরের জন্মতিথিকে স্মরণীয় করে রাখতে আজ বিকেলে প্রেসক্লাব যশোরের গোলাম মাজেদ মিলনায়তনে এক বর্ণাঢ্য শুভেচ্ছা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা জন্মবার্ষিকী উদযাপন পর্ষদ’। প্রবীণ এই জননেতার বর্ণিল কর্মময় জীবনকে শ্রদ্ধা জানাতে এবং তাঁকে জন্মদিনের ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা উপহার দিতে আজ সেখানে সমবেত হচ্ছেন যশোরের সর্বস্তরের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং সাধারণ মানুষ। অ্যাডভোকেট রবিউল আলমের লড়াইটি আজও ফুরিয়ে যায়নি, কারণ তিনি আজও সমানভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার এবং মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের এক ক্লান্তিহীন অভিযাত্রী। স্ফুলিঙ্গ পরিবারের পক্ষ থেকে যশোরের এই প্রিয় অভিভাবক ও বীর সেনানীর জন্মদিনে রইল পরম বিনম্র শ্রদ্ধা ও অন্তহীন শুভেচ্ছা। শুভ জন্মদিন, হে চিরলড়াকু বীর।  ছবি সংগৃহীত।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *