জাকির হোসাইন (তুষার), মহম্মদপুর (মাগুরা) প্রতিনিধি :
মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলায় পশু জবাই ও মাংস বিক্রিতে সরকারি বিধিবিধান মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। নির্ধারিত কসাইখানার অভাব, পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়াই জবাই, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং মূল্য নৈরাজ্যের কারণে জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় ভোক্তারা। অভিযোগ রয়েছে, উপজেলার ৩১টি হাট-বাজারের কোনোটিতেই প্রাণিসম্পদ বিভাগের নিয়মিত তদারকি বা স্বাস্থ্য পরীক্ষা কার্যক্রম নেই।
সরেজমিনে দেখা যায়, মহম্মদপুর সদর বাজারসহ উপজেলার অধিকাংশ বাজারে পশু জবাইয়ের জন্য কোনো নির্ধারিত কসাইখানা নেই। প্রতিদিন ভোরে কসাইরা নিজ নিজ বাড়ির আঙিনা, রাস্তার ধারে, নদীর ধারে কিংবা বাজারের বিভিন্ন কোণায় গরু-ছাগল জবাই করেন। পরে মাংস খোলা ভ্যান, ড্রাম বা অন্যান্য অনিরাপদ উপায়ে বাজারে এনে বিক্রি করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জবাইয়ের আগে পশুর কোনো স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয় না। ফলে বাজারে বিক্রি হওয়া মাংস সুস্থ নাকি অসুস্থ পশুর, তা যাচাইয়ের কোনো সুযোগ নেই। এতে রোগাক্রান্ত কিংবা মরণাপন্ন পশুর মাংস বাজারে আসার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
প্রচলিত ‘পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইন’ অনুযায়ী, জবাই ও মাংস বিপণনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সংক্রামক রোগমুক্ত হওয়ার সনদ থাকতে হবে এবং পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষাসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে এসব বিধানের কোনো প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন সচেতন নাগরিকরা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মহম্মদপুর সদর বাজারে প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০টি গরু এবং ১০ থেকে ১৫টি ছাগল জবাই করা হয়। এছাড়া উপজেলার অন্যান্য বাজারেও নিয়মিত পশু জবাই হচ্ছে। অতীতে একাধিকবার অসুস্থ ও রোগাক্রান্ত পশু জবাই করে মাংস বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। এমনকি রোগাক্রান্ত পশুর মাংস বিক্রির দায়ে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে শাস্তির ঘটনাও রয়েছে।
শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকিই নয়, মাংসের বাজারে মূল্য ও মান নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। ক্রেতাদের দাবি, বকনা বা গাভীর মাংস এঁড়ে গরুর মাংসের সমমূল্যে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হচ্ছে। অন্যদিকে খাসির মাংসের দাম নেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমানের বা বয়স্ক মাদী ছাগলের মাংস খাসি হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে।
গরুর মাংস বিক্রেতা ফিরোজ হোসেন বলেন, “মহম্মদপুরে পশু জবাইয়ের জন্য কোনো নির্ধারিত কসাইখানা নেই। বর্জ্য ফেলারও ব্যবস্থা নেই। বাধ্য হয়ে বিভিন্ন স্থানে বর্জ্য ফেলতে হয়। এতে দুর্গন্ধ ছড়ায় এবং পরিবেশ দূষিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে আমরা একটি আধুনিক কসাইখানার দাবি জানিয়ে আসছি।” তিনি আরও বলেন, নির্ধারিত জবাইখানা না থাকায় অধিকাংশ ব্যবসায়ী নিজ বাড়িতে পশু জবাই করেন, যা আইনসম্মত নয়।
মাংস কিনতে আসা স্থানীয় বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “আমরা জানিই না পশুগুলো কোথায়, কীভাবে জবাই করা হচ্ছে হুজুর দিয়ে দোয়া কালাম পড়ে জবাই করা হয় কিনা তাও জানিনা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা দূরের কথা।”
অপর ক্রেতা টুকু মিয়া বলেন, “খাসির মাংসের দাম দিয়ে অনেক সময় বয়স্ক মাদী ছাগলের মাংস দেওয়া হচ্ছে। আবার এঁড়ে গরুর নামে গাভীর মাংস বিক্রি হচ্ছে। বাজারে কোনো মূল্য তালিকা বা মান যাচাইয়ের ব্যবস্থা নেই।”
মহম্মদপুর বাজার বণিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি আখতারুজ্জামান বিল্লাহ বলেন, “উপজেলা সদরে একটি আধুনিক কসাইখানা অত্যন্ত জরুরি। নির্দিষ্ট কসাইখানা না থাকায় ব্যবসায়ীদের শতভাগ জবাবদিহির আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রশাসন উদ্যোগ নিলে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব।”
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, প্রাণিসম্পদ বিভাগ দীর্ঘদিন ধরে বাজার তদারকিতে নিষ্ক্রিয় রয়েছে। নিয়মিত মনিটরিং ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা না থাকায় জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ছে এবং আইন অমান্য করেও অনেকেই পার পেয়ে যাচ্ছে।
পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও মাঠপর্যায়ে দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তার বিষয়টি স্বীকার করে মহম্মদপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সুব্রত সেন বলেন, “উপজেলার বিভিন্ন বাজারে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা কার্যক্রম চালু করার বিষয়ে আমরা কাজ করছি। জনবল ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা থাকলেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। খুব শিগগিরই বাজার তদারকি জোরদার করা হবে।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মহম্মদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বেদবতি মিস্ত্রী বলেন, “সাংবাদিকদের মাধ্যমেই আমি বিষয়টি প্রথম জানতে পারলাম। আমি এই উপজেলায় সদ্য যোগদান করেছি। পশুর ফিটনেস সার্টিফিকেট ছাড়া যত্রতত্র পশু জবাই এবং মাংসের বাজারে মূল্য নৈরাজ্য কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। আমি জরুরি ভিত্তিতে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলছি এবং সমন্বয়ের মাধ্যমে আপাতত একটি অস্থায়ী কসাইখানা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করা যায়।” তিনি আরও বলেন, “স্থায়ী ও আধুনিক কসাইখানা নির্মাণের বিষয়েও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। পাশাপাশি মাংসের বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং ভোক্তাদের অধিকার রক্ষায় আগামী দু-একদিনের মধ্যেই উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।”
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসনের ঘোষিত উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন হলে মহম্মদপুরের মাংস বাজারে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মূল্য নৈরাজ্যের অবসান ঘটবে এবং ভোক্তারা নিরাপদ মাংস কেনার সুযোগ পাবেন। ছবি প্রতিবেদক।

