রফিক মন্ডল কোটচাঁদপুর (ঝিনাইদহ) থেকে।। ০৬ জুন ২৬
আইন, আদালত, স্থানীয় প্রশাসন কিংবা সংবাদকর্মীদের অনবরত কলম যুদ্ধ—কাগজে-কলমে সব সচল থাকলেও বাস্তবে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলায় একশ্রেণির প্রভাবশালী ও বেপরোয়া ‘মাটিখেকো’ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য থামানোর যেন কেউ নেই। উপজেলার অতি জনগুরুত্বপূর্ণ কালীগঞ্জ-কোলা রোডটি এখন আর কোনো সাধারণ চলাচলের সড়ক নয়, ক্ষমতার দাপটে অবৈধ ড্রাম ট্রাকের ফেলা মাটিতে এটি এখন যেন সাধারণ মানুষের জন্য সাক্ষাৎ এক ‘মরণফাঁদ’। আজ শনিবার (৬ জুন, ২০২৬) দুপুরে এলাকায় সামান্য একটু বৃষ্টি হতেই এই জনবহুল সড়কে উন্মোচিত হয়েছে দৃশ্যমান তথাকথিত উন্নয়নের পেছনের এক কদর্য ও কঙ্কালসার রূপ।
দিন-রাত নিয়মবহির্ভূতভাবে চলা মাটিবাহী ড্রাম ট্রাক থেকে প্রতিনিয়ত রাস্তায় ঝরে পড়া মাটির পুরু প্রলেপটি সামান্য বৃষ্টিতে ভিজে পুরো রাস্তাটিকে যেন এক পিচ্ছিল ‘সাবানের ঘাটে’ পরিণত করেছিল। আর এই মানবসৃষ্ট পিচ্ছিল মরণফাঁদে ব্রেক কষতেই চাকা পিছলে পড়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ২৫ থেকে ৩০ জন মোটরসাইকেল আরোহী ও সাধারণ পথচারী হাত-পা ভেঙে রাস্তায় ছিটকে পড়ে মারাত্মক রক্তাক্ত ও গুরুতর জখম হয়েছেন। চোখের পলকে ব্যস্ততম সড়কটি যেন এক রক্তাক্ত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয় এবং চারদিক থেকে ভুক্তভোগীদের আকুল আর্তচিৎকার ভেসে আসতে থাকে। এই ভয়াবহ ও অরাজক পরিস্থিতিতে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও গণমাধ্যমকর্মীরা অতি জরুরি ভিত্তিতে ফায়ার সার্ভিসের সহযোগিতা কামনা করলেও তাদের কোনো সাড়া বা উদ্ধার তৎপরতা পাওয়া যায়নি, যা বিপদে পড়া সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও ভোগান্তিকে আরও চরমে পৌঁছে দিয়েছে।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগী এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে কোলা রোড দিয়ে দিন-রাত বুক ফুলিয়ে বুক চিরে অবৈধ ড্রাম ট্রাক এবং লাইসেন্সবিহীন মাহিন্দ্রা-ট্রাক্টর দিয়ে অবাধে আবাদি জমির মাটি ও বালি টানা হচ্ছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী মাটি বহনের সময় ট্রাকে ত্রিপল দিয়ে ঢেকে রাখার কঠোর বাধ্যবাধকতা থাকলেও, ক্ষমতার দাপটে এবং স্থানীয় প্রশাসনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সম্পূর্ণ খোলা ট্রাকে অবাধে মাটি নেওয়া হচ্ছিল। ফলে প্রতিনিয়ত সড়কজুড়ে চলন্ত ট্রাক থেকে ঝরে পড়েছে শুকনো মাটি। আজ দুপুরে হঠাৎ সামান্য একটু বৃষ্টি নামতেই সেই জমাট বাঁধা শুকনো মাটি গলে একাকার হয়ে পিচ্ছিল কাদার এক ভয়ংকর স্তরে রূপ নেয়। এরপরই শুরু হয় সড়কে বিভীষিকা; কোলা রোড দিয়ে যাওয়ার সময় একের পর এক মোটরসাইকেল একটু ব্রেক করলেই চাকা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ছিটকে পড়তে থাকে। স্থানীয় বাসিন্দারাই মূলত মানবিকতার খাতিরে ঘর থেকে ছুটে এসে একে একে ২৫ থেকে ৩০ জন আহত পথচারী ও আরোহীকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে পাঠান। এই সড়কে অবৈধ মাটি কাটা নিয়ে স্থানীয় সংবাদকর্মীরা এ পর্যন্ত গণমাধ্যমে অসংখ্য সচিত্র ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন এবং প্রশাসনও মাঝে মধ্যে লোকদেখানো ‘মোবাইল কোর্ট’ পরিচালনা করে দু-একটি নামমাত্র জরিমানা করেছে। কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি; বরং মাফিয়া চক্রটি জরিমানা দিয়ে এসে পরের দিন দ্বিগুণ উৎসাহে এবং আরও বেশি দাপটের সাথে আবার মাটি কাটা শুরু করে।
প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট জরুরি সেবা সংস্থাগুলোর এমন চরম উদাসীনতা, ব্যর্থতা ও ঠুঁটো জগন্নাথ রূপের মুখে কোলা রোডের এই মরণযজ্ঞ চিরতরে থামাতে এবং নিরীহ এলাকাবাসীকে রক্ষা করতে এখন ঝিনাইদহ-৪ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য মাওলানা আবু তালিবের জরুরি, সরাসরি ও ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ কামনা করছেন সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় সচেতন মহল। স্থানীয় বাসিন্দারা প্রশাসনের ফাঁকা বুলি ও লোকদেখানো নজরদারির ওপর পূর্ণ অনাস্থা প্রকাশ করে চরম ক্ষোভের সাথে জানান যে, তাঁরা আর কোনো প্রকার কালক্ষেপণ বা আশ্বাসের ফাঁকা বুলি শুনতে চান না। সংসদ সদস্য মাওলানা আবু তালিবের ওপর তাঁদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে এবং তাঁরা আশা করেন যে, তিনি সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে এই অবৈধ মাটিখেকো সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য চিরতরে গুঁড়িয়ে দিতে এবং এই মরণযজ্ঞের সাথে জড়িত মূল হোতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ফৌজদারি আইনি ব্যবস্থা নিতে অবিলম্বে স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে শক্ত ও আপোষহীন নির্দেশ প্রদান করবেন। ছবি সংগৃহীত।

