স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা মানছে না যশোরে নীলগঞ্জে অবস্থিত প্রগতি বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষা করেই ওই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক মাসুদুর রহমানের নেতৃত্বে গড়ে তোলা হয়েছে ড্রিম টাচ কোচিং সেন্টার। ওই কোচিংয়ে শিক্ষার্থীদের ভর্তি হতে জিম্মি করা,হুবহু প্রশ্নপত্র ফাঁস করাসহ নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ড চলছে। অথচ অজ্ঞাত কারণে তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না শিক্ষা প্রশাসন ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যশোর শহরের নীলগঞ্জ মেইন রোডের সাথে তিন তলা বিল্ডিং ভাড়া নিয়ে ড্রিম টাচ নামে কোচিং সেন্টার পরিচালনা করেছেন প্রগতি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাসুদুর রহমান। দেখে বোঝার উপায় নেই এটি স্কুল নাকি কোচিং সেন্টার। সেখানে প্রায় আড়াই শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে । কোচিংয়ে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে প্রতিমাসে ৬০০ টাকা থেকে শুরু করে আড়াই হাজার টাকা নেয়া হচ্ছে । ওই কোচিং সেন্টারের কাগজ কলমে মাসুদুর রহমানের শ্যালককে পরিচালক উল্লেখ করলেও সব কার্যক্রম পরিচালনা করেন মাসুদুর রহমান নিজেই । তার সাথে ওই কোচিংয়ে প্রগতি বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষক আশরাফুল ইসলাম, তাপস কুমার ঘোষসহ কয়েকজন ক্লাস করান ।
প্রগতি বালিকা বিদ্যালয়ের এসব শিক্ষকেরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিজ প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ে ভর্তি বাধ্যতামূলক করেছেন । ক্লাসে রীতিমতো শিক্ষার্থীদের বলে দেয়া হয়, পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করতে হলে ড্রিম টাচ কোচিংয়ে ভর্তি হতে হবে। কেউ কোচিং সেন্টারে ভর্তি না হলে পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেয়া হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা এক প্রকার জিম্মি হয়ে ওই কোচিংয়ে পড়তে বাধ্য হচ্ছে। কোচিং এর ধার্যকৃত টাকা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।তাদের পরিবারের ওপর বাড়ছে আর্থিক চাপ ।
সম্প্রতি ওই স্কুলের এক শিক্ষার্থীকে ড্রিম টাচ কোচিংয়ে ভর্তির জন্য অতিরিক্ত চাপ দেয়া হয়। অন্যথায় তাকে পরীক্ষায় ফেল করানোর ভয় দেখানো হয়। ওই শিক্ষার্থী এবিষয়টি তার ম্যাজিস্ট্রেট মামাকে জানালে তিনি শিক্ষক মাসুদুর রহমানকে ফোন করেন । ম্যাজিস্ট্রেট পরিচয় শুনে তাৎক্ষণিক ক্ষমা চেয়ে নেন মাসুদুর রহমান।
সুত্র মতে, ড্রিম টাচ কোচিং সেন্টারে প্রগতি বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শতভাগ টানতে পরীক্ষার আগের দিন সট সাজেশনের নামে কোচিং সেন্টারে প্রশ্নপত্র ফাঁস করে দেয়া হয় । ব্ল্যাকবোর্ডে ওই প্রশ্নপত্র লিখে দিয়ে বলা হয় এগুলো গুরুত্ব সহকারে পড়বে । পরের দিন হুবহু ওই প্রশ্নগুলোই পরীক্ষার হলে কমন দেখতে পাই শিক্ষার্থীরা। যারা কোচিংয়ে পড়ে তারা বাকিদের থেকে পরীক্ষায় বেশি নাম্বার পায় ।
এ দেখে ছাত্রীরা ড্রিম টাচ কোচিংয়ে ভর্তি হচ্ছে। ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা মেধাশূন্য হয়ে পড়েছে। স্কুলের পরীক্ষা কমিটিতে ওই শিক্ষকেরা যুক্ত থাকায় গোপনীয়তা লংঘন করে ফাঁস করা হয় প্রশ্নপত্র।
সুত্র বলছে, ওই স্কুলের শিক্ষক মাসুদুর রহমানের সিন্ডিকেট কাছে রীতিমতো অসহায় হয়ে পড়েছেন খোদ প্রধান শিক্ষক রমাকান্ত বিশ্বাস। মাসুদুর রহমান সমাজ বিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে ওই স্কুলের যোগদান করলেও কোচিংয়ে শিক্ষার্থী কালেকশনের সুবিধার্থে জোরপূর্বক ইংরেজি ক্লাস করান। অথচ স্কুলটিতে ইংরেজির জন্য আলাদা শিক্ষক রয়েছে । কিন্তু বেশিরভাগ শিক্ষক মাসুদুর রহমানের সাথে কোচিং সেন্টার পরিচালনা করায় তার বিরুদ্ধে কেউ কথা বলে না।
সুত্র মতে, সরকার কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে মনোযোগী করার লক্ষ্যে সরকার ২০১২ সালে নীতিমালা কার্যকর করে। ওই নীতিমালায় নির্দেশনা দেয়া হয়, শিক্ষকরা নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কোচিং বা প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না । শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠানের প্রধানের লিখিত অনুমতি নিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ জন পড়ানো যাবে । কিন্তু পরীক্ষার সময় বা বিশেষ পরিস্থিতিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সব ধরনের কোচিং সেন্টার সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। এই নীতিমালা অমান্য করলে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা বা এমপিও (MPO) বাতিল করা হবে । কিন্তু যশোর শিক্ষা বোর্ড এবং জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মাত্র দেড় কিলোমিটারের মধ্যে গড়ে ওঠা ড্রিম টাচ কোচিং সেন্টারটি কিভাবে দীর্ঘদিন যাবত পরিচালিত হচ্ছে তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে । শিক্ষা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে চলছে সমালোচনা ।
অভিযোগের বিষয়টি জানতে চাইলে প্রগতি বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাসুদুর রহমান সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি কোচিং সেন্টারে পার্ট-টাইম শিক্ষক হিসেবে ক্লাস করান । এর বাইরে কোচিং এর সাথে তার কোন সংশ্লিষ্টতা নেই ।
তবে অভিযোগের বিষয়ে সত্যতা স্বীকার করেছেন প্রগতি বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রমাকান্ত বিশ্বাস । তিনি বলেছেন, অনেকবার মাসুদুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের কোচিং করাতে নিষেধ করেছি । কিন্তু তার কথা শিক্ষকের মান্য করেননি ।
স্কুলের প্রশ্নপত্র কোচিং সেন্টারে ফাঁস ও একজন ম্যাজিস্ট্রেটের ভাগ্নীকে ফেল করানোর হুমকির বিষয় তিনি বলেন,বিষয়টি আমি লোকমুখে শুনেছি
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে যশোর জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মাহফুজুল হোসেন বলেন, অভিযোগের বিষয় সঠিক হলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে ।ছবি সংগৃহীত।


