চৌগাছা থেকে ফিরে নিজস্ব প্রতিবেদক :
‘ভবিষ্যতে ক্ষমতায় আসলে দেখে নেওয়া হবে’—এমন রাজনৈতিক হুমকি ও পূর্বশত্রুতার জেরে যশোরের চৌগাছায় জুয়েল রানা (৪০) নামে এক আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ কর্মীকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন ২০২৬) দুপুরে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
নিহত জুয়েল রানা চৌগাছা উপজেলার পাতিবিলা ইউনিয়নের মুক্তদাহ গ্রামের ওদুদ খন্দকারের ছেলে। এই হত্যাকাণ্ডের পর মুক্তদাহ গ্রাম ও আশপাশের এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
এলাকাবাসী ও স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্র থেকে জানা গেছে, নিহত জুয়েল রানা স্থানীয় যুবলীগের রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে চৌগাছা থানায় তিনটি অপরাধমূলক মামলা রয়েছে। সম্প্রতি স্থানীয় কয়েকজন বিএনপি কর্মীকে রাজনৈতিকভাবে ‘দেখে নেওয়ার’ হুমকি দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকার একাংশের সাথে জুয়েল রানার তীব্র বৈরিতা ও কোন্দল তৈরি হয়। আজ সকালে সেই পুরনো হুমকির রেশ ধরেই প্রতিপক্ষ গ্রুপের সাথে তাঁর নতুন করে বাগবিতণ্ডা শুরু হয়, যা একপর্যায়ে নৃশংস হত্যাকাণ্ডে রূপ নেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আজ সকালে মুক্তদাহ মোড়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের জেরে জুয়েল রানার সঙ্গে স্থানীয় ইউসুফ, কাশেম ও বাবুর নেতৃত্বে প্রতিপক্ষ গ্রুপের লোকজনের তীব্র কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে অভিযুক্তরা লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে জুয়েল রানার ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলাকারীরা তাঁকে মাটিতে ফেলে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে গুরুতর জখম করে এবং লাঠি দিয়ে আঘাত করে তাঁর দুই পায়ের হাঁটুর নিচের হাড় ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়।
তবে এই ঘটনার পেছনে আরও বেশি নির্মমতার অভিযোগ এনে নিহতের স্ত্রী মায়া বেগম এক ভিন্ন দাবি করেছেন। তিনি কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে সাংবাদিকদের বলেন, “সকালে আমার স্বামী স্থানীয় মোড়ে চা খেতে গিয়েছিলেন। তখন অভিযুক্তরা তাঁকে পরিকল্পিতভাবে ডেকে নিয়ে যায়। এরপর একটি খুঁটির সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে রেখে জুয়েল রানাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ও পিটিয়ে রক্তাক্ত করে হামলাকারীরা চলে যায়।”
গুরুতর জখম ও মুমূর্ষু অবস্থায় স্থানীয়রা জুয়েল রানাকে উদ্ধার করে প্রথমে চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে রেফার করেন। পরে বেলা ১২টা ২৫ মিনিটে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। বর্তমানে নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান ও আইনগত পদক্ষেপের বিষয়ে জানতে চাইলে চৌগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মামুনুর রশিদ বলেন, “নিহত জুয়েল রানা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে থানায় পূর্বে দায়ের হওয়া তিনটি নিয়মিত মামলা রয়েছে। রাজনৈতিক বিরোধসহ হত্যাকাণ্ডের সঠিক কারণ উদঘাটনে পুলিশ কাজ করছে। ঘটনার সাথে জড়িত মূল আসামিদের শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে চিরুনি অভিযান পরিচালনা করছে।”
এদিকে প্রকাশ্য দিবালোকে এই হত্যাকাণ্ডের পর পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ও পাল্টা হামলা এড়াতে মুক্তদাহ গ্রামসহ পুরো এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। ছবি সংগৃহীত।

