কুপ্রস্তাবের প্রতিবাদ করায় গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে পিটিয়ে ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দিল প্রভাবশালীরা!

কুপ্রস্তাবের প্রতিবাদ করায় গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে পিটিয়ে ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দিল প্রভাবশালীরা!

রফিক মন্ডল, নিজস্ব প্রতিবেদক কোটচাঁদপুর (ঝিনাইদহ) ২৩ মে -২০২৬

ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরের জয়দিয়া পালপাড়ায় এক অসহায় দিনমজুর গৃহবধূর সম্ভ্রম ও নিরাপত্তার ওপর নেমে এসেছে মধ্যযুগীয় বর্বরতা। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবেশী এক প্রভাবশালীর কুপ্রস্তাব ও উত্যক্তকরণের প্রতিবাদ করায় প্রকাশ্য দিবালোকে রাস্তার ওপর বিবস্ত্র করে পেটানো হয়েছে ৪৫ বছর বয়সী এক জননীকে। এখানেই শেষ হয়নি পিশাচদের তাণ্ডব; রক্তাক্ত শরীরে থানায় বিচার চাইতে যাওয়ায় চরম ক্ষিপ্ত হয়ে গভীর রাতে ওই গৃহবধূর বসতভিটায় চালানো হয়েছে সশস্ত্র তাণ্ডব। ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে মাথা গোঁজার একমাত্র ঠাঁই, আর বোনকে বাঁচাতে গিয়ে বখাটেদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে রক্তগঙ্গায় ভেসেছেন ভাই।
গত শুক্রবার (২২ মে) বিকেলে শুরু হওয়া এই ধারাবাহিক পৈশাচিকতায় এখন থমথমে পুরো এলাকা। ভুক্তভোগী গৃহবধূ মোছাঃ নাজমা খাতুন (৪৫) ওই এলাকার নুর আলমের স্ত্রী। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার পর পুরো জয়দিয়া পালপাড়ার বাতাসে এখন শুধু আর্তনাদ আর ক্ষোভের বারুদ।

স্থানীয় ও ভুক্তভোগীর পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, জয়দিয়া পালপাড়ার মল্লিক মন্ডলের ছেলে বিষে মন্ডল দীর্ঘদিন ধরেই নাজমা খাতুনকে একা পেলেই নানা রকম কুপ্রস্তাব ও কু-ইঙ্গিত দিয়ে আসছিল। লোকলজ্জা আর চরম দারিদ্র্যের কারণে এতদিন মুখ বুজে অশ্রু বিসর্জন দিলেও গত শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে নাজমার।
তিনি যখন ফুফাতো বোনের বাড়িতে যাচ্ছিলেন, তখন রাস্তার মোড়ে বিষে মন্ডল আবারও তার পথরোধ করে নোংরা ভাষা ব্যবহার শুরু করে। নাজমা এর তীব্র প্রতিবাদ করতেই বিষে মন্ডলের তিন ছেলে— হিলাল, আমির হোসেন ও ইবরাহীম পূর্বপরিকল্পিতভাবে দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে হন্যে হয়ে ছুটে আসে। চারজন মিলে প্রকাশ্য দিবালোকে নাজমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, লাঠিসোঁটা দিয়ে পিটিয়ে শরীর রক্তাক্ত করার পাশাপাশি ছিঁড়ে ফেলা হয় তার পরনের কাপড়। লুণ্ঠিত হয় একজন নারীর চিরকালের সম্ভ্রম। এ সময় তার কান ছিঁড়ে দুল, গলার চেইন এবং হাতের মোবাইল ফোনটি ছিনিয়ে নিয়ে উল্লাস করতে করতে চলে যায় নরপশুরা।

রক্তাক্ত ও বিধ্বস্ত পোশাকে নাজমা খাতুন সেদিনই বিকেলে স্থানীয় সাফদারপুর পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে অশ্রুভেজা চোখে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। কিন্তু স্বাধীন দেশে আইনের দ্বারে যাওয়াটাই যেন তার জন্য সবচেয়ে বড় অপরাধ হয়ে দাঁড়াল।
থানা থেকে অভিযোগ দিয়ে বাড়ি ফিরতে না ফিরতেই বিষে মন্ডল ও তার বখাটে ছেলেরা আরও হিংস্র রূপ ধারণ করে। “কত বড় সাহস, আমাদের নামে থানায় মামলা করিস!”— এই হুঙ্কার দিয়ে তারা নাজমার জীর্ণ ঘরে দা, রামদা ও লাঠিসোঁটা নিয়ে দ্বিতীয় দফায় হামলা চালায়। মুহূর্তের মধ্যে ঘরের আসবাবপত্র, হাঁড়ি-পাতিল ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। বোনকে বাঁচাতে ভাই জসিম এগিয়ে এলে তাকেও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ও পিটিয়ে রক্তাক্ত জখম করে উঠানে ফেলে রাখা হয়।
*”আমরা গরিব বলে কি আমাদের ইজ্জতের কোনো দাম নেই?”*
অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে, কাঁপতে কাঁপতে নির্যাতিতা নাজমা খাতুন বলেন, “আমি গরিব দিনমজুরের বউ বলে লম্পট বিষে মন্ডল দীর্ঘদিন ধরে আমার ইজ্জতের ওপর নজর দিয়েছিল। লোকলজ্জায় কাউকে বলিনি। কিন্তু কাল যখন আল্লাহর দরবারে বিচার দিয়ে ওর মুখের ওপর প্রতিবাদ করলাম, ওরা আমাকে রাস্তার মাঝে বিবস্ত্র করে মারল। থানায় গেলাম বিচারের আশায়, ফিরে এসে দেখি আমার ঘরবাড়ি ভেঙে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে, আমার ভাইয়ের রক্তে উঠান ভেসে গেছে! আমরা গরিব বলে কি বিচার পাব না? আমি এই জানোয়ারদের ফাঁসি চাই!”

ঘটনার পর প্রধান অভিযুক্ত বিষে মন্ডলের সাথে যোগাযোগ করা হলে সে অত্যন্ত নির্বিকার ভঙ্গিতে পুরো ঘটনাটিকে অস্বীকার করে এবং সাংবাদিকদের বলে, “আমাদের সাথে সামান্য কথা কাটাকাটি হয়েছিল, মারধর বা ভাঙচুরের কোনো ঘটনা ঘটেনি। পারিবারিক শত্রুতার জেরে আমাদের ফাঁসাতে এসব নাটক সাজানো হচ্ছে।”
তবে জয়দিয়া পালপাড়ার ক্ষুব্ধ প্রতিবেশীরা বিষে মন্ডলের এই দাবিকে চরম মিথ্যাচার বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। এলাকাবাসী জানান, ভুক্তভোগী পরিবারটি অত্যন্ত নিরীহ ও দিনমজুর। অন্যদিকে অভিযুক্তরা অর্থ ও পেশী শক্তিতে প্রভাবশালী হওয়ায় এলাকায় প্রায়ই এমন ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। একজন নারীর শ্লীলতাহানি ও পুরো পরিবারকে রক্তাক্ত করার এই ঘটনার পর অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে এখন ফুঁসে উঠেছে কোটচাঁদপুরের সাধারণ মানুষ।

সাফদারপুর পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং ভয়াবহ। একজন নারীর ওপর এই বর্বরতা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু হয়েছে। ঘটনার পর থেকেই আসামিরা পলাতক রয়েছে, তবে তাদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশের বিশেষ অভিযান অব্যাহত আছে। ছবি সংগৃহীত।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *