কাউন্টারে রিজেক্ট, দালালের হাতে গেলেই ফিট!

কাউন্টারে রিজেক্ট, দালালের হাতে গেলেই ফিট!

স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :

যশোর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসকে ঘিরে গড়ে ওঠা শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেট ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রকাশ্য ঘুষ বাণিজ্য কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যে ঝটিকা অভিযান চালিয়ে দালাল চক্রের সদস্যদের আটক করা হলেও, কিছুদিন পরই পরিস্থিতি আবার ‘যে লাউ সেই কদু’ হয়ে দাঁড়ায়। কাউন্টারে সাধারণ আবেদনকারীদের ফাইল নানাবিধ অজুহাতে ফেরত দিয়ে কর্মকর্তাদের ‘চোখের ইশারায়’ বাইরে অপেক্ষমাণ দালালদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়ার এক অভিনব ফাঁদ তৈরি হয়েছে এখানে। এই সিন্ডিকেটের হাত এতই শক্তিশালী যে, বছরের পর বছর ধরে জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় একাধিকবার সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পরও অদৃশ্য খুঁটির জোরে বহাল তবিয়তে চলছে এই জনভোগান্তি।

অনুসন্ধানে ও ভুক্তভোগীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগে জানা যায়, যশোর পাসপোর্ট অফিসে পয়সা বা উপর মহলের সুনির্দিষ্ট তদবির ছাড়া সাধারণ মানুষের কোনো কাজই সহজে সমাধান হয় না। কাউন্টারের পাশে ও অফিসের আনাচে-কানাচে ওত পেতে থাকা ৪০ থেকে ৪৫ জনের দালাল চক্রটি মূলত ভেতরের কর্মকর্তাদের নির্দেশেই কাজ করে। নিয়ম অনুযায়ী কোনো সেবাগ্রহীতা অনলাইনে ফি জমা দিয়ে আবেদনপত্র জমা দিতে গেলে এনআইডি যাচাই, পেশাগত তথ্যের অমিল, নাগরিক সনদ, বিদ্যুৎ বিল কিংবা বিয়ের কাবিননামার মতো সাধারণ বিষয়গুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে বড় অসঙ্গতি হিসেবে দেখিয়ে ফাইলটি বাতিল বা ফেরত দেওয়া হয়। কাউন্টার থেকে ফাইলটি ফেরত দেওয়ার পরপরই কর্মকর্তাদের প্রচ্ছন্ন ইশারায় দালালরা ভুক্তভোগীর কাছে এসে হাজির হয় এবং ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকা, ক্ষেত্রবিশেষে আরও বেশি অর্থের বিনিময়ে সেই বাতিল হওয়া ফাইলটিই অলৌকিকভাবে কাউন্টারে জমা করিয়ে দেয়। ভুক্তভোগী রাজি হলেই কাগজপত্রে দেয়া হয় সাংকেতিক চিহ্ন। এই সাংকেতিক চিহ্নই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।জনশ্রুতি রয়েছে, এই অতিরিক্ত অনৈতিক টাকার ভাগ অফিসের একেবারে নিম্নশ্রেণি থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা পর্যন্ত পৌঁছায়।

উদ্বেগজনক এই পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন শার্শা থানার রফিকুল ইসলাম,বাঘারপাড়ার আমিরুল ফকির, বেসরকারি চাকরিজীবী সুমাইয়া আক্তার সহ অনেক ভুক্তভোগী। সুমাইয়া আক্তারের এনআইডি ও বর্তমান পেশার অমিল এবং আমিরুল ফকিরের নামে বিদ্যুৎ বিল না থাকার মতো ঠুনকো ও অযৌক্তিক কারণে প্রথমে ফাইল জমা নেওয়া হয়নি। অথচ পরবর্তীতে দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার পর সেই আবেদনগুলো কোনো বাধা ছাড়াই অনায়াসে গৃহীত হয়। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ডিজিটাল সেবার আড়ালে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে এই পকেট কাটার মহোৎসব প্রতিদিন সবার চোখের সামনে ঘটছে। অথচ এ বিষয়ে অফিসের প্রধান উপপরিচালক (ডিডি) মহের উদ্দিন শেখের কাছে জানতে চাইলে তিনি প্রথাগতভাবে ‘কিছুই জানেন না’ বলে দাবি করেন। তাঁর নাকের ডগায় এই শক্তিশালী সিন্ডিকেট চললেও প্রশাসনের এমন উদাসীনতায় ক্ষোভের শেষ নেই স্থানীয় সাধারণ নাগরিকদের।

স্থানীয় ভুক্তভোগী ও সচেতন মহলের প্রশ্ন, আর কতদিন এভাবে সরকারি সেবা নিতে এসে সাধারণ মানুষকে চরম হয়রানি ও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে? মাঝেমধ্যে লোকদেখানো অভিযানে দুই-চারজন দালাল ধরা পড়লেও মূল হোতা ও ভেতরের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সব সময় অধরাই থেকে যায়। ফলে কারাগার থেকে জামিনে বের হয়ে বা পরিস্থিতি ঠাণ্ডা হলে দালালেরা আবারও পুরোনো উদ্যমে সক্রিয় হয়ে ওঠে। যশোরবাসীর দাবি, এই দীর্ঘদিনের স্থায়ী ভোগান্তি দূর করতে হলে শুধু মাঠপর্যায়ের দালাল ধরা নয়, বরং পাসপোর্ট অফিসের ভেতরের কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং পুরো ডিজিটাল প্রক্রিয়াকে সিসিটিভি নজরদারির আওতায় এনে একটি স্বচ্ছ ও দালালমুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। ছবি সংগৃহীত।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *