স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
যশোর সদর উপজেলার ৫ নম্বর উপশহর ইউনিয়ন পরিষদের কর্মরত ও পোশাক পরিহিত এক গ্রাম পুলিশ সদস্যের ওপর দায়িত্ব পালনকালে বর্বরোচিত শারীরিক নির্যাতন, পেশাগত অবমাননা এবং পরবর্তীতে উচ্ছেদসহ সপরিবারে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার এক চাঞ্চল্যকর ও ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও দোষীদের অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবিতে আজ শনিবার (২৩ মে) বাংলাদেশ গ্রাম পুলিশ বাহিনী কর্মচারী ইউনিয়ন যশোর জেলা শাখার পক্ষ থেকে যশোর জেলা প্রশাসক (ডিসি) বরাবর একটি সুনির্দিষ্ট লিখিত স্মারকলিপি ও অভিযোগপত্র প্রদান করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী ও স্মারকলিপির আবেদনকারী গ্রাম পুলিশ সদস্য হলেন—উপশহর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত গ্রাম পুলিশ ৫/১ হিসেবে কর্মরত মোঃ নজরুল ইসলাম। তিনি স্থানীয় মৃত নিয়ামত আলীর পুত্র এবং একজন হৃদরোগী বলে জানা গেছে। পোশাক পরিহিত একজন সরকারি অবৈতনিক কর্মীর ওপর এমন বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহল ও গ্রাম পুলিশ কর্মচারীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
জেলা প্রশাসক বরাবর পেশকৃত স্মারকলিপি ও ঘটনার বিবরণ থেকে জানা গেছে, গত ১৫ মে (২০২৬) ইংরেজী তারিখে উপশহর ইউনিয়ন পরিষদে পোশাক পরিহিত অবস্থায় নৈশ ডিউটি বা দায়িত্ব পালন করছিলেন গ্রাম পুলিশ নজরুল ইসলাম। রাত আনুমানিক ১টার কুড়ির দিকে তিনি উপশহর বি-ব্লক বাজারে আরজানের দোকানে চা পান করতে যান। এ সময় উপশহরের বাসিন্দা মৃত জামাল চৌধুরীর পুত্র রনি চৌধুরী এবং তাঁর ভাই স্থানীয় বিএনপি ও যুবদল নেতা হিসেবে পরিচিত বুলবুল আহমেদ ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে অতর্কিতভাবে নজরুল ইসলামের ওপর চড়াও হন। তারা কোনো কারণ ছাড়াই প্রকাশ্য বাজারে পোশাক পরিহিত নজরুল ইসলামকে শারীরিকভাবে চরম লাঞ্ছিত ও মারপিট করে তাঁর পবিত্র পেশাকে চরমভাবে অবমাননা করেন। স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, এই বর্বরোচিত ঘটনার সময় নজরুলের সহকর্মী আব্দুল আলিম দফাদারসহ স্থানীয় বহু ব্যবসায়ী ও নৈশপ্রহরী প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
স্মারকলিপির বিশেষ দফায় ভুক্তভোগী আরও অভিযোগ করেন, তিনি যশোর হাউজিং কর্তৃপক্ষের সম্পত্তিতে বিগত প্রায় ৪০ বছর ধরে সপরিবারে বসতি স্থাপন করে আসছেন। কিন্তু বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে অবৈধ কোটা ভিত্তিক ওই জমিটি রনি ও বুলবুল নামের দুই ভাই অবৈধভাবে প্লট হিসেবে নিজেদের নামে বরাদ্দ নেন। এখন সেই অবৈধ বরাদ্দের জের ধরে তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে নজরুল ইসলামের বসতভিটা থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করার চক্রান্ত চালাচ্ছে। এর প্রতিবাদ করায় এবং থানায় অভিযোগ করার চেষ্টা করায় আসামিরা রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে নজরুল ইসলামকে প্রকাশ্য দিবালোকে খুন ও জখম করার চূড়ান্ত হুমকি প্রদান করে আসছে। এছাড়া নজরুলের স্ত্রীকে নানামুখী প্রলোভন দেখিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা পারিবারিক মামলা দায়েরের অপচেষ্টাও চালানো হচ্ছে বলে স্মারকলিপিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ঘটনার অনুলিপি বিভাগীয় কমিশনার (খুলনা), জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই), যশোর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং যশোর প্রেসক্লাব সভাপতি বরাবরও প্রেরণ করা হয়েছে।
এদিকে, গুরুতর এই অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত রনি চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি মারপিট ও জমি দখলের বিষয়টি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও মিথ্যা দাবি করে বলেন, “আমাদের বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ ভিত্তিহীন। মূলত ঘটনার রাতে গ্রাম পুলিশ ঝন্টু (নজরুল) যশোরের শীর্ষ স্থানীয় নেতৃবৃন্দের নামে অত্যন্ত কুৎসিত ও অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করছিল। আমরা সচেতন নাগরিক হিসেবে শুধু সেই নোংরা গালিগালাজের তীব্র প্রতিবাদ করেছি মাত্র, কোনো মারধরের ঘটনা ঘটেনি।”
তবে মারাত্মক ও দুঃখজনক বিষয় হলো, মামলার অপর মূল অভিযুক্ত ও স্থানীয় যুবদল নেতা বুলবুল আহমেদের কাছে সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে এই সংবেদনশীল অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি চরম ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করেন। সাংবাদিকদের সামনেই তিনি অত্যন্ত অশালীন ও অশ্লীল ভাষা উচ্চারণ করে জেলা প্রশাসকের দপ্তরের সিলমোহর সম্বলিত অভিযোগপত্রটি ছুড়ে ফেলে দেন, যা তাঁর পেশী শক্তি ও ধৃষ্টতারই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন সাধারণ মানুষ। বাংলাদেশ গ্রাম পুলিশ বাহিনী কর্মচারী ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, স্বাধীন দেশে একজন সরকারি পোশাকধারী কর্মীকে পিটিয়ে যুবদল নেতার এমন দাম্ভিক আচরণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। জেলা প্রশাসক মহোদয় এই স্মারকলিপি গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেছেন এবং দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে রনি ও বুলবুলকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা না করা হলে জেলা জুড়ে গ্রাম পুলিশ সদস্যরা কঠোর কর্মবিরতিসহ বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেবেন বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। ছবি সংগৃহীত।


