আধা ঘণ্টার আলো, এক ঘণ্টার অন্ধকার!

আধা ঘণ্টার আলো, এক ঘণ্টার অন্ধকার!

মোঃ মাসুদ রানা, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি:

তীব্র দাবদাহ আর ভ্যাপসা গরমের মাঝেই ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলায় নজিরবিহীন ও ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকটে জনজীবন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত ও ওষ্ঠাগত হয়ে পড়েছে। ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) ও পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন বিস্তীর্ণ এলাকায় টানা পাঁচ দিন ধরে চলমান অনিয়মিত ও তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে সাধারণ গ্রাহকদের ভোগান্তি এখন চরম সীমায় পৌঁছেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দিনে ও রাতে মাত্র আধঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকার পর টানা এক ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রাখা হচ্ছে, যার ফলে উপজেলার দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, বিশেষ করে গৃহস্থালি ও দাপ্তরিক কাজ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।

গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া এই নজিরবিহীন বিদ্যুৎ সংকট আজ শুক্রবার পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, অফিস আদালত এবং জরুরি সেবামূলক খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তীব্র গরমে একদিকে যেমন ঘরে থাকা শিশু ও বৃদ্ধদের নাভিশ্বাস উঠছে, অন্যদিকে রান্নাবান্না, খাদ্য সংরক্ষণ এবং পানির পাম্পের মাধ্যমে পানি উত্তোলন বন্ধ থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন গৃহিণীরা।

মহিলা কলেজ এলাকার বাসিন্দা শারমিন আক্তার জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় প্রচণ্ড গরমে শিশুদের নিয়ে ঘরে টেকা যাচ্ছে না, খাবার নষ্ট হচ্ছে এবং গৃহস্থালির সব কাজ অচল হয়ে পড়েছে। একই চিত্র উপজেলার নিশ্চিন্তপুর এলাকাতেও। সেখানে রাতের বেলা ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে মানুষের ঘুম হারাম হয়ে গেছে।

সবচেয়ে বড় বিপাকে পড়েছে চলতি মাসে চলমান মাধ্যমিক ও মাদ্রাসা পর্যায়ের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার্থীরা এবং আগামী ২ জুলাই থেকে শুরু হতে যাওয়া এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীরা। পরীক্ষার এই চূড়ান্ত মুহূর্তে অনলাইন ক্লাস, কম্পিউটার চালিত পড়াশোনা এবং রাতে পড়ার টেবিলে আলো না থাকায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা চরম উদ্বিগ্ন সময় পার করছেন।

লোডশেডিংয়ের তীব্র নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কালীগঞ্জের স্থানীয় বাণিজ্যিক খাতেও। মেইন বাসস্ট্যান্ড এলাকার ওয়েল্ডিং ওয়ার্কশপ মালিক সমিতির সভাপতি শহিদুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, তাদের পুরো কারখানা বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। দিনভর বিদ্যুৎ না থাকায় তারা ক্রেতাদের সময়মতো অর্ডার সরবরাহ করতে পারছেন না, যাতে বড় ধরনের আর্থিক লোকসানের পাশাপাশি ব্যবসায়িক সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। পৌরসভার সামনে প্রিন্ট ও ফটোকপি ব্যবসায়ী মাসদুর রহমান জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় দোকান খুলে বসে থেকেও কোনো কাজ করা যাচ্ছে না, চাকরিপ্রার্থী ও শিক্ষার্থীরা সেবা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।

বিদ্যুৎ সংকটের বিষয়ে কালীগঞ্জ ওজোপাডিকোর উপসহকারী আবাসিক প্রকৌশলী মিলন চন্দ্র সরকার জানান, জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতি এবং জ্বালানি সংকটের কারণে চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়েই রেশনিং বা লোড ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ সচল রাখতে হচ্ছে। তবে তিনি আশার বাণী শুনিয়ে বলেন, পৌর এলাকার শ্রীরামপুরে একটি নতুন বিদ্যুৎ সাবস্টেশনের নির্মাণকাজ একদম শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এটি চালু হলে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি লোডশেডিং অনেকাংশে কমে আসবে। আগামী রোববারের মধ্যে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সাব-ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার (অফিস প্রধান) জয়দীপ সরকার জানান, কালীগঞ্জে বিদ্যুতের উচ্চ চাহিদার বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে বর্তমানে মাত্র ১০ থেকে ১২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।

এই চরম জনদুর্ভোগের বিষয়ে ঝিনাইদহ-৪ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য মাওলানা আবু তালিব জানান, দেশের কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র কারিগরি ত্রুটির কারণে সাময়িক বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে এই ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তিনি নিজে ইতোমধ্যে ঢাকা ও সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের সাথে কথা বলেছেন এবং দ্রুত এই সংকট নিরসনে সরকারের উচ্চপর্যায়ে পুনরায় যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন। তীব্র গরম ও লোডশেডিংয়ের এই মরণফাঁদ থেকে বাঁচতে এবং ব্যবসা ও শিক্ষাব্যবস্থাকে সচল করতে অনতিবিলম্বে কালীগঞ্জে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন সর্বস্তরের ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণ।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *