স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
বিদেশে অবস্থানরত এক প্রবাসীর হোয়াটসঅ্যাপ (WhatsApp) অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে, তিনি সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে আইসিইউতে ভর্তি আছেন—এমন ভুয়ো ও স্পর্শকাতর নাটক সাজিয়ে তাঁর পরিবারের কাছ থেকে প্রায় ৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। এই চাঞ্চল্যকর ডিজিটাল প্রতারণার ঘটনায় সাতক্ষীরায় এক ঝটিকা অভিযান চালিয়ে আন্তঃজেলা প্রতারক চক্রের দুই মূলহোতাকে গ্রেফতার করেছে যশোর জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেল।
আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন ২০২৬) ভোর ৫টা ৪০ মিনিটে সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার নলতা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের হাতেনাতে আটক করা হয়।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন— সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বসুখালী গ্রামের নজরুল ইসলাম গাজীর ছেলে আব্দুর রাজ্জাক গাজী (৩৯) এবং একই উপজেলার পশ্চিম নলতা গ্রামের আব্দুল্লাহর ছেলে আবীর হোসেন (২৫)।
মামলা ও ডিবি পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার শংকরপুর গ্রামের বাসিন্দা বিপ্লব হোসেন দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ায় প্রবাসী হিসেবে কর্মরত আছেন। গত ২০২৫ সালের ৩১ অক্টোবর একদল সংঘবদ্ধ সাইবার অপরাধী অত্যন্ত সুকৌশলে প্রবাসী বিপ্লবের ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরটি হ্যাক করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়।
এরপর চক্রটি বাংলাদেশে থাকা বিপ্লবের স্ত্রী রুম্পা বেগমের হোয়াটসঅ্যাপে কল দিয়ে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়ায়। তারা জানায়, মালয়েশিয়ায় এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় বিপ্লব গুরুতর আহত হয়েছেন এবং বর্তমানে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালের আইসিইউতে (ICU) মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। তাকে বাঁচাতে হলে এখনই জরুরি অপারেশন ও চিকিৎসার জন্য বিপুল পরিমাণ টাকা প্রয়োজন।
প্রবাসে স্বামীর এমন চরম বিপদের কথা শুনে এবং হ্যাকারদের পাতানো ফাঁদে পা দিয়ে সম্পূর্ণ দিশেহারা হয়ে পড়েন রুম্পা বেগম। তিনি নিজের ও স্বজনদের কাছ থেকে ধারদেনা করে দ্রুততম সময়ে প্রতারকদের দেওয়া বিভিন্ন বিকাশ ও নগদ নম্বরে ধাপে ধাপে মোট ৬ লাখ ৯০ হাজার ৪৫৫ টাকা পাঠান। পরবর্তীতে টাকা পাঠানো শেষ হলে রুম্পা বেগম অন্য মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় তাঁর প্রবাসী স্বামীর সাথে সরাসরি যোগাযোগ করতে সক্ষম হন। তখন তিনি জানতে পারেন যে বিপ্লব সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন এবং তাঁর কোনো ধরনের দুর্ঘটনাই ঘটেনি।
ডিজিটাল প্রতারণার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর প্রবাসীর স্ত্রী রুম্পা বেগম বাদী হয়ে ঝিকরগাছা থানায় সাইবার নিরাপত্তা আইনে একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেন। মামলাটির তদন্তভার দেওয়া হয় যশোর ডিবির চৌকস সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেলের উপ-পরিদর্শক (এসআই) দেবব্রত ঘোষের ওপর।
পরবর্তীতে ডিবির সাইবার সেল আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং কল ডিটেইলস রেকর্ড (CDR) বিশ্লেষণ করে অভিযুক্তদের সুনির্দিষ্ট অবস্থান শনাক্ত করে। আজ বৃহস্পতিবার ভোরে সাতক্ষীরার নলতা এলাকায় ঝটিকা অভিযান চালিয়ে রাজ্জাক ও আবীরকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতারের সময় মূলহোতা আব্দুর রাজ্জাক গাজীর কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া নগদ ৩৫ হাজার৬০০ টাকা, দুটি দামি মোবাইল ফোন, একাধিক ভুয়া সিম কার্ড এবং একটি অ্যাপাচি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়। এছাড়া অপর আসামি আবীর হোসেনের কাছ থেকেও প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত মোবাইল ও সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে।
যশোর ডিবি পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেফতারকৃত দুই আসামিকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ঝিকরগাছা থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এই চক্রের সাথে আর কারা জড়িত এবং এর আগে তারা কতজন প্রবাসীর পরিবারের সাথে এমন প্রতারণা করেছে, তা খতিয়ে দেখতে রিমান্ডের আবেদনসহ আসামিদের বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করার প্রক্রিয়া চলছে। ছবি সংগৃহীত।


