মহম্মদপুরে মাটি খেকোদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অ্যাকশন

মহম্মদপুরে মাটি খেকোদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অ্যাকশন

জাকির হোসাইন (তুষার), মহম্মদপুর (মাগুরা):

মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলায় ফসলি জমি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে অবৈধ মাটি খেকো সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করেছে স্থানীয় প্রশাসন। উপজেলার মৌশা গ্রামে সরকারি অনুমতি ছাড়াই নির্বিচারে কৃষিজমির মাটি কাটার অপরাধে হাতেনাতে দুই ব্যক্তিকে আটক করে দুই মাস করে সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। প্রশাসনের এই আকস্মিক ও দৃষ্টান্তমূলক অভিযানে উপজেলার অবৈধ মাটি ব্যবসায়ী চক্রের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

গত রবিবার (১৪ জুন) বিকেলে এই তথ্য নিশ্চিত করে প্রশাসন জানায়, সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা হলেন—উপজেলার হরেকৃষ্ণপুর গ্রামের ওদুদ মোল্লার ছেলে মো. লিংকন মোল্লা এবং মৃত হাসেম মোল্লার ছেলে মো. আশিকুর রহমান মুরাদ।

উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মহম্মদপুরের বিভিন্ন গ্রামীণ জনপদে দীর্ঘদিন ধরে একটি অসাধু ও প্রভাবশালী চক্র আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে কৃষিজমি ও তিন ফসলি জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি (টপ সয়েল) কেটে বিভিন্ন ইটভাটায় বিক্রি করে আসছিল। এতে একদিকে যেমন আবাদি জমির স্থায়ী ক্ষতি হচ্ছিল, অন্যদিকে মাটি টানা ভারী ড্রাম ট্রাকের অবাধ চলাচলে গ্রামীণ রাস্তাঘাট ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছিল।

রবিবার বিকেলে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মহম্মদপুর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাদমান আকিবের নেতৃত্বে মৌশা গ্রামে এক ঝটিকা অভিযান চালানো হয়। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, প্রশাসনের কোনো অনুমতি ছাড়াই শক্তিশালী ভেকু (স্কেভেটর) মেশিন দিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে বিপুল পরিমাণ মাটি কেটে সাবাড় করা হচ্ছে। এ সময় অপরাধের সাথে সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়ে লিংকন ও মুরাদকে আটক করা হয়। পরে ঘটনাস্থলেই ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে ‘বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০’-এর সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী তাঁদের প্রত্যেককে দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের পরিবর্তে সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।

সরকারি অনুমতি ছাড়া বা ইজারা বহির্ভূত স্থান থেকে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে মাটি বা বালু উত্তোলন করা দেশের প্রচলিত আইনে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অপরাধের গভীরতা বিবেচনা করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আসামিদের সরাসরি কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

পরিবেশবিদ ও কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, আবাদি জমির উপরিভাগের মাটি কেটে নিলে সেই জমির উর্বরতা ফিরতে অন্তত ১০ থেকে ১৫ বছর সময় লেগে যায়। এছাড়া নির্বিচারে মাটি কাটার ফলে বর্ষা মৌসুমে পার্শ্ববর্তী জমিগুলো ধসে পড়ে এবং কৃত্রিম জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়, যা সামগ্রিক গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য এক বড় মরণফাঁদ।

অভিযান শেষে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাদমান আকিব গণমাধ্যমকে বলেন, “কৃষিজমি আমাদের জাতীয় সম্পদ। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পকেট ভারী করার জন্য পরিবেশ ও ফসলি জমি ধ্বংস করতে দেওয়া হবে না। অবৈধ মাটি কাটা ও বালু উত্তোলনের সাথে জড়িত সিন্ডিকেট যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তাদের কোনো ছাড় নেই। জনস্বার্থে মহম্মদপুরে এই ধরনের সাঁড়াশি অভিযান আরও জোরদার ও নিয়মিত করা হবে।”

এদিকে, প্রশাসনের এই সময়োপযোগী ও সাহসী পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন মহম্মদপুরের সচেতন নাগরিক সমাজ ও ভুক্তভোগী সাধারণ কৃষকেরা। তবে স্থানীয়দের দাবি, মাঠপর্যায়ের এই চুনোপুঁটিদের সাজার পাশাপাশি নেপথ্যে থাকা মূল হোতা, ভেকু মেশিনের মালিক এবং প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকদেরও যদি আইনের আওতায় আনা যায়, তবেই মহম্মদপুর থেকে এই মাটিকাটার উৎসব চিরতরে নির্মূল করা সম্ভব হবে। ছবি সংগৃহীত।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *