বরুণ হত্যায় খোদ নিজ ভাইয়েরই হাত!

বরুণ হত্যায় খোদ নিজ ভাইয়েরই হাত!

রফিক মন্ডল, কোটচাঁদপুর (ঝিনাইদহ) থেকে।। ২২ জুলাই-২০২৬

ঝিনাইদহের বহুল আলোচিত বরুণ কুমার ঘোষ হত্যা মামলার স্বাভাবিক বিচারিক প্রক্রিয়া ভেস্তে দেওয়া, আদালতে সাক্ষীকে প্রাণনাশের হুমকি এবং নিহতের কোটি কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার সুগভীর ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উঠেছে নিহতেরই আপন বড় ভাইয়ের বিরুদ্ধে। নিহত বরুণের স্ত্রী টুম্পা রানী ঘোষের বিস্ফোরক দাবি— তাঁর ভাসুর অরুণ কুমার ঘোষ মামলার আসামিদের সাথে হাত মিলিয়ে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার পাঁয়তারা করছেন এবং সম্ভবত বরুণ হত্যার নেপথ্যে তাঁর নিজেরই পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে।

আজ বুধবার (২২ জুলাই ২০২৬) বিকেলে ঝিনাইদহ প্রেসক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করার সময় এসব আশঙ্কাজনক অভিযোগ তোলেন নিহতের স্ত্রী টুম্পা রানী ঘোষ।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে কান্নাজড়িত কণ্ঠে টুম্পা রানী জানান, ২০২৪ সালের ৯ জানুয়ারি তাঁর স্বামী বরুণ কুমার ঘোষ নির্মমভাবে খুন হন। চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলায় গত ২২ জুন ঝিনাইদহ আদালতে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল। ওইদিন তিনি ঢাকা হাইকোর্টের দুজন আইনজীবী ও নিজের ভাইকে সঙ্গে নিয়ে সাক্ষ্য দিতে আদালত প্রাঙ্গণে পৌঁছালে তাঁর ভাসুর অরুণ কুমার ঘোষ এবং তাঁর সহযোগী তনুপ ঘোষসহ কয়েকজন জজ কোর্টের ভেতরের পরিবেশেই তাঁদের ঘিরে ধরে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। এতে চরম আতঙ্কিত হয়ে সেদিন তিনি আদালতের এজলাসে সাক্ষ্য দিতে পারেননি। তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, বিচারালয়ের সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ বিশ্লেষণ করলেই বিচারপ্রক্রিয়ায় বাধার এই সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলবে।

ভাসুরের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলে টুম্পা রানী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “আমার স্বামী হত্যাকাণ্ডের মাত্র ৬ মাস পেরোতে না পেরোতেই ভাসুর অরুণ আমার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন দেওয়ানি মামলা ঠুকে দেন, যেন আমি কোনো সম্পত্তি হস্তান্তরিত না করতে পারি। অথচ প্রকৃত সত্য হলো— তিনি নিজেই প্রতারণামূলক ১৬টি দলিলের মাধ্যমে বরুণের প্রায় ১৪৩.৫০ একর জমি ইতিমধ্যেই বিক্রি করে দিয়েছেন। এমনকি তিনি বিভিন্ন আইনজীবীদের চেম্বারে বসে হত্যা মামলার মূল আসামিদের সঙ্গে গোপনে দীর্ঘ বৈঠক চালিয়ে যাচ্ছেন। আসামিদের সাথে নিহতের আপন ভাইয়ের এ কিসের বৈঠক? কেনই বা আমাকে সাক্ষ্য দিতে বারবার বাধা দেওয়া হচ্ছে? এসব সন্দেহজনক আচরণ প্রমাণ করে যে স্বামী বরুণ হত্যার পেছনে খোদ অরুণ ঘোষের সরাসরি হাত রয়েছে।”

অরুণ ঘোষের প্রভাব বিস্তার সম্পর্কে তিনি অভিযোগ করে বলেন, অরুণ অতীতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর নির্বাচনী তহবিল জোগানদাতা ও সক্রিয় অনুসারী ছিলেন। তবে ২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তিনি নিজেকে বিএনপির প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন। স্থানীয় জেলা বিএনপির নাম ভাঙিয়ে এবং অবৈধ অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তিনি এখন তাঁদের বসতভিটা, দোকানপাট ও গাছপালা গ্রাস করার গভীর চক্রান্ত চালাচ্ছেন।

টুম্পা রানী জানান, চরম নিরাপত্তাহীনতা ও প্রাণভয়ে তিনি ইতোমধ্যে ভাসুর ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে ঝিনাইদহ সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং- ১২৩৬, তারিখ: ১৯/০৭/২০২৬) করেছেন। ভাসুরের অত্যাচারের টিকতে না পেরে বর্তমানে তিনি তাঁর নাবালিকা কন্যা সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে ঝিনাইদহের হামদহ ঘোষপাড়ার ভিটেমাটি ছেড়ে যশোরের বাপের বাড়িতে পালিয়ে এসে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। সংবাদ সম্মেলন থেকে তিনি স্বামীর নির্মম হত্যার সুষ্ঠু বিচার লাভ এবং পিতৃহারা কন্যাসন্তানের আইনি অধিকার ও সম্পত্তি ফেরত পেতে প্রধানমন্ত্রীর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন। সংবাদ সম্মেলন চলাকালে নিহত বরুণের শ্বশুর সুভাষ ঘোষ এবং শ্যালক আকাশ ঘোষ উপস্থিত ছিলেন। ছবি সংগৃহীত।

আরো পড়ুন

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *