ঐচ্ছিক তহবিলের টাকা এমপির পকেটে!

ঐচ্ছিক তহবিলের টাকা এমপির পকেটে!

নড়াইল প্রতিনিধি:

নড়াইল-২ (সদর ও লোহাগড়া একাংশ) আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা মো. আতাউর রহমানের (বাচ্চু) সরকারি ঐচ্ছিক তহবিলের অনুদান বরাদ্দের একটি সরকারি তালিকা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনা ও তোলপাড় শুরু হয়েছে। সচিবালয় থেকে চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত ওই বিতর্কিত তালিকায় খোদ সংসদ সদস্যের নিজের মেয়ের নাম দুইবার অন্তর্ভুক্ত করে টাকা বরাদ্দ দেওয়ার পাশাপাশি সিংহভাগ বরাদ্দ নিজ ও শ্বশুরবাড়ির এলাকায় দেওয়ার মাধ্যমে চরম স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে।

গত শুক্রবার (২৬ জুন) ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপ ও পেজে সচিবালয় থেকে ইস্যু করা ওই অনুদানের তালিকাটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি সর্বসাধারণের সম্মুখে আসে।

সচিবালয় থেকে অনুমোদিত ওই সরকারি পত্রে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য সংসদ সদস্যের ঐচ্ছিক তহবিল থেকে মোট ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫০০ টাকা ২১ জন সুবিধাভোগীর মাঝে বরাদ্দের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে তালিকার ১ নম্বর এবং ৮ নম্বর ক্রমিকে ‘ফাইজা’ নামে একই ব্যক্তির নাম রাখা হয়েছে। চাতুরতার আশ্রয় নিয়ে ১ নম্বর ক্রমিকে ফাইজার পিতার নাম দেওয়া হয়েছে ‘মো. বাচ্চু’ (সংসদ সদস্যের ডাকনাম) এবং ৮ নম্বর ক্রমিকে পিতার নাম লেখা হয়েছে ‘মো. আতাউর’ (সংসদ সদস্যের মূল নাম)। উভয় এন্ট্রিতেই ১০ হাজার টাকা করে মোট ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী ও স্থানীয়দের দাবি, তালিকায় থাকা এই ‘ফাইজা’ মূলত সংসদ সদস্য আতাউর রহমান বাচ্চুর আপন মেয়ে। একই ব্যক্তিকে দুই নামে দেখিয়ে সরকারি অর্থ লোপাটের এই চেষ্টায় ক্ষুব্ধ নড়াইলবাসী। এ ছাড়া তালিকার ভৌগোলিক বিন্যাসে চরম আঞ্চলিকতা ও স্বজনপ্রীতির প্রমাণ মিলেছে। নড়াইল সদর উপজেলার ১০ জন সুবিধাভোগীর মধ্যে ৯ জনই সংসদ সদস্যের নিজ ইউনিয়ন ‘হবখালী’র বাসিন্দা। অন্যদিকে লোহাগড়া উপজেলার ১১ জনের মধ্যে ৭ জনই তাঁর শ্বশুরবাড়ির এলাকা ‘লাহুড়িয়া’র বাসিন্দা। অর্থাৎ, পুরো নির্বাচনী এলাকার সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করে কেবল নিজের স্বজনদেরই এই অনুদান দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে আজ শনিবার (২৭জুন ) দুপুরের পর আতাউর রহমান বাচ্চু গণমাধ্যমের কাছে ভাইরাল হওয়া তালিকাটির সত্যতা অকপটে স্বীকার করেন। তবে চুরির দায় নিজের কাঁধ থেকে সরিয়ে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত সচিবের (পিএস) ওপর চাপিয়েছেন।

সংসদ সদস্য মো. আতাউর রহমান সাফাই গেয়ে বলেন, “আমি তখন নড়াইলে ছিলাম না। আমার পিএস জানিয়েছিলেন যে দ্রুত একটি তালিকা জমা দিতে হবে। আমি তাঁকে সব ইউনিয়ন থেকে নাম সংগ্রহ করতে বলেছিলাম। পরে পিএস আমাকে জানান যে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা শুরুতে বরাদ্দটি পাস করানোর জন্য যেকোনো একটি ডামি তালিকা জমা দিতে পরামর্শ দিয়েছেন, যাতে বরাদ্দটি অনুমোদিত হয় এবং পরে নাম চূড়ান্ত করা যাবে।”

তিনি আরও দাবি করেন, “আমার সই করা লেটারহেড প্যাডটি পিএসের কাছে ঢাকাতেই ছিল। আমি তাঁকে পরিচিত লোকজনের নাম দিয়ে একটি তালিকা তৈরি করতে বলেছিলাম। সেই কারণেই হয়তো আমার পরিবার এবং পরিচিত এলাকার নামগুলো তালিকায় ঢুকে গেছে। আমি মেয়ের নামে ১০ হাজার টাকা নেওয়ার মতো মানুষ নই। যেহেতু এই তালিকা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, আমি অনুমোদিত তালিকা অনুযায়ী টাকা বিতরণ করব না, বরং নতুন একটি তালিকা ইউএনও-র কাছে জমা দেব।”

তবে সংসদ সদস্যের এই মনগড়া নতুন তালিকা দেওয়ার কোনো আইনি সুযোগ নেই বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন নড়াইল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) টি এম রাহসিন কবির।

ইউএনও সাংবাদিকদের জানান, “এমপির ডিও লেটারের (আধা-সরকারি পত্র) ভিত্তিতেই সরাসরি সচিবালয় থেকে এই অনুদান সুনির্দিষ্ট নামে অনুমোদিত হয়ে এসেছে। বিদ্যমান সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, অনুমোদিত তালিকায় যাঁদের নাম আছে কেবল তাঁরাই এই টাকা পাবেন। যদি কোনো সুবিধাভোগী (যেমন এমপির মেয়ে) টাকা গ্রহণ না করেন, তবে সেই টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত চলে যাবে। নতুন করে অন্য কাউকে এই টাকা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তালিকায় কোনো ধরনের সংশোধন বা নাম পরিবর্তন করতে হলে পুনরায় সচিবালয়ের উচ্চপর্যায়ের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে।”ছবি সংগৃহীত।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *