মোঃ মাসুদ রানা, ঝিনাইদহ প্রতিনিধি :
ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জরুরি মুহূর্তে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স না পাওয়ায় অবহেলা ও দেরিতে এক মুমূর্ষু রোগীর মৃত্যুর মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। এই চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন ঘটনার প্রেক্ষিতে হাসপাতাল এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত সরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালক বকুল মিয়াকে আটক করেছে। আজ বুধবার (৩ জুন, ২০২৬) দুপুরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণ থেকে তাঁকে আটক করা হয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, শৈলকুপা উপজেলার বারইপাড়া গ্রামের মৃত রওশন শেখের ছেলে আবু জাফর কুসুম (৬৫) আজ বুধবার সকালের দিকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন। ভর্তির পর তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে উন্নত ও জরুরি চিকিৎসার জন্য অবিলম্বে অন্যত্র বা জেলা হাসপাতালে রেফার্ড করার পরামর্শ দেন।
ভুক্তভোগী রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তাঁরা দ্রুত রোগীকে স্থানান্তরের জন্য হাসপাতালের সরকারি অ্যাম্বুলেন্সটি চাইলে চালক বকুল মিয়া গাড়িতে জ্বালানি তেল নেই বলে যেতে স্পষ্ট অস্বীকৃতি জানান। পরবর্তীতে রোগীর অসহায় স্বজনরা নিরুপায় হয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত অর্থেই প্রয়োজনীয় তেলের টাকা দিতে রাজি হলেও এবং বারবার অনুরোধ করলেও চালক বকুল মিয়া গাড়ি নিয়ে যেতে কোনোভাবেই রাজি হননি। ফলে প্রত্যন্ত এলাকা থেকে অন্য কোনো বিকল্প জরুরি যানবাহনের ব্যবস্থা করতে মারাত্মক বিলম্ব ঘটে এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পাওয়ায় একপর্যায়ে আবু জাফর কুসুম হাসপাতালেই ছটফট করে মারা যান। এই মর্মান্তিক মৃত্যুর পর নিহতের স্বজন ও স্থানীয় জনতা হাসপাতালের ভেতরে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করলে একপর্যায়ে সেখানে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন বাদী হয়ে চালক বকুল মিয়ার বিরুদ্ধে শৈলকুপা থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন এবং সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই থানা পুলিশ দ্রুত হাসপাতাল থেকে চালককে আটক করে।
নিহত কুসুমের ভাতিজা উল্লাস হোসাইন অত্যন্ত আক্ষেপ ও কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমরা নিজেরা তেলের টাকা দিতে চেয়ে চালককে বারবার হাত-পা ধরে অনুরোধ করেছিলাম, তাও তিনি গাড়ি বের করেননি। গাড়ি না দেওয়ায় অন্য গাড়ি খুঁজতে দেরি হলো আর সেই ফাঁকে চোখের সামনে আমার কাকা বিনা চিকিৎসায় মারা গেলেন। শৈলকুপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি-তদন্ত) শাকিল আহমেদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আরএমও’র পক্ষ থেকে একটি সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পরপরই অভিযুক্ত চালককে থানায় এনে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং পুরো বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এদিকে আটক হওয়া চালক বকুল মিয়ার বিরুদ্ধে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহারে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরণের অনিয়ম ও দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি নিজে সরকারি দায়িত্ব পালন না করে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে একজন বহিরাগত অপেশাদার ব্যক্তিকে দিয়ে নিয়মিত অ্যাম্বুলেন্স পরিচালনা করাতেন এবং অসহায় রোগীদের জিম্মি করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করতেন। শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রাশেদ আল মামুন এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, এই মুমূর্ষু রোগী মৃত্যুর ঘটনাটি স্পষ্টতই চরম অবহেলার পর্যায়ে পড়ে। এছাড়া তিনি নিজে গাড়ি না চালিয়ে বহিরাগত লোক রাখার যে অভিযোগ উঠেছে, তা প্রাথমিকভাবে সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে; বিষয়টি স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিস্তারিত জানানো হয়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া দ্রুত চলমান রয়েছে। ছবি সংগৃহীত।


