মোঃ মাসুদ রানা কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ প্রতিনিধি:
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র জনবল সংকট বিরাজ করছে। হাসপাতালের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একাধিক কারিগরি ও প্রশাসনিক পদ শূন্য থাকায় সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, চালক না থাকায় হাসপাতালের ফুল বাগানের মালী চালাচ্ছেন সরকারি অ্যাম্বুলেন্স এবং স্টোরকিপারের মূল দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন একজন হারবাল অ্যাসিস্ট্যান্ট।
৫০ শয্যাবিশিষ্ট এই সরকারি হাসপাতালে বর্তমানে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও), প্রধান অফিস সহকারী, স্টোরকিপার, অ্যাম্বুলেন্স চালক, ইসিজি ম্যান ও আল্ট্রাসনোগ্রাফি টেকনিশিয়ানসহ প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির মোট ৮৩টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণির ১৬টি, দ্বিতীয় শ্রেণির ৬টি, তৃতীয় শ্রেণির ৪৩টি এবং চতুর্থ শ্রেণির ১৮টি পদ খালি পড়ে আছে।
সরেজমিনে পরিদর্শনে জানা যায়, গত প্রায় ছয় বছর ধরে স্টোরকিপারের পদটি শূন্য থাকায় বাধ্য হয়ে সেই অতিরিক্ত দায়িত্ব সামলাচ্ছেন হারবাল অ্যাসিস্ট্যান্ট মাহবুবুর রহমান। অন্যদিকে, অ্যাম্বুলেন্স চালকের কোনো পদায়ন না থাকায় খুলনার সিভিল সার্জনের বিশেষ অনুমোদনে হাসপাতালের মালী মিলন হোসেন জরুরি অ্যাম্বুলেন্স চালাচ্ছেন, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
হাসপাতাল সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এখানে চিকিৎসকদের জন্য অনুমোদিত ৪৩টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২১ জন। এছাড়া মেডিসিন, গাইনি, অর্থোপেডিক ও শিশু বিভাগসহ ১১টি বিশেষজ্ঞ পদের বিপরীতে রয়েছেন মাত্র ৫ জন চিকিৎসক। ফলে গ্রামীণ ও দরিদ্র রোগীরা উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং তাদের বাধ্য হয়ে জেলা সদর বা দূরবর্তী হাসপাতালে যেতে হচ্ছে।
উপজেলা সদরের পাশাপাশি প্রান্তিক পর্যায়ের চিকিৎসাসেবায়ও একই চিত্র দেখা গেছে। বলরামপুর ও বারোবাজার উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসকের সংকট প্রকট। বলরামপুর কেন্দ্রের চিকিৎসক ডেপুটেশনে অন্যত্র থাকায় সেবাদান কার্যক্রম প্রায় বন্ধ, আর বারোবাজারে চলছে সীমিত পরিসরে। উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জন্য ১১ জন উপ-সহকারী মেডিকেল অফিসার (সেকমো) থাকার কথা থাকলেও বেশ কয়েকজন অন্য জেলায় ডেপুটেশনে থাকায় তৃণমূলের স্বাস্থ্যসেবা ভেঙে পড়েছে। এছাড়া ২৯টি কমিউনিটি ক্লিনিকে কোনো চিকিৎসক না থাকায় সিএইচসিপি কর্মীরাই নামমাত্র সেবা দিচ্ছেন, যেখানে ওষুধেরও তীব্র ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি টিকাদান কার্যক্রমে ৩৯ জন স্বাস্থ্য সহকারীর জায়গায় মাত্র ১৩ জন কর্মরত থাকায় শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হচ্ছে।
এ বিষয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. অরুণ কুমার দাস জানান, তিনি কয়েক মাস আগে দায়িত্ব নিয়েছেন। জনবল সংকটের কারণে মানসম্মত সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।
কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা নাহিদ বলেন, হাসপাতালের এসব সমস্যার কথা আমরা জানি। জেলা সিভিল সার্জন সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে দ্রুত সমস্যা সমাধানের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ঝিনাইদহের সিভিল সার্জন ডা. কামরুজ্জামান জনবল সংকটের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, দীর্ঘদিন নতুন নিয়োগ না হওয়ায় এই শূন্যতা তৈরি হয়েছে। মালী দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স চালানোর বিষয়টিও সত্য। আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে পুরো বিষয়টি অবহিত করেছি এবং দ্রুত এই সংকট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি।
এদিকে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমিটির সভাপতি মাওলানা আবু তালিব বলেন, হাসপাতালটির সার্বিক সংকটের বিষয়টি আমার নজরে আছে। অত্র অঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠীর উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হাসপাতালটিকে ৫০ শয্যা থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা জরুরি। আমি এই বিষয়টি জাতীয় সংসদে তুলে ধরে দ্রুত বাস্তবায়নের সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। ছবি সংগৃহীত।

