স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
দেশের অন্যতম বৃহৎ স্থলবন্দর যশোরের শার্শা উপজেলার বেনাপোল কাস্টমস হাউসের নিলাম শাখার সরকারি গুদাম থেকে ত্রাণের মালের আড়ালে সম্পূর্ণ অবৈধ ও অতিরিক্ত কোটি কোটি টাকার ভারতীয় বাণিজ্যিক মালামাল পাচারের এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা উন্মোচিত হয়েছে। এই জঘন্য জালিয়াতি ও চুরির ঘটনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে কাস্টমসের দুই প্রভাবশালী সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা এবং তিন সিপাইকে চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। বরখাস্তকৃতরা হলেন— সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ মুখার্জী, আরিফুল ইসলাম চৌধুরী এবং কাস্টমসের তিন সিপাই জামশেদ, সাগর ও হামিদুর রহমান।
বেনাপোল কাস্টমস হাউসের দায়িত্বশীল ও নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা গেছে, গত ২১ জুন দিবাগত গভীর রাতে কাস্টমসের নিলাম শাখার সুরক্ষিত সরকারি গুদাম থেকে সরকারি ত্রাণ ভাণ্ডারে পাঠানোর উদ্দেশ্যে একটি বড় কাভার্ডভ্যানে মালামাল লোড করার প্রক্রিয়া চলছিল। গভীর রাতে পণ্য লোডিংয়ের এই পুরো প্রক্রিয়ার ওপর কাস্টমস হাউসের কেন্দ্রীয় সিসিটিভি কন্ট্রোল রুম থেকে নজরদারি করা হয়। ফুটেজে স্পষ্ট দেখা যায়, অনুমোদিত নির্ধারিত ত্রাণের মালের বাইরে অতিরিক্ত বিপুল পরিমাণ অবৈধ পণ্য একাধিকবার অত্যন্ত সুকৌশলে কাভার্ডভ্যানে ওঠানো-নামানো হচ্ছিল। এ সময় জালিয়াতির স্পটে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম চৌধুরী ও সিপাই সাগরের সন্দেহজনক উপস্থিতি এবং গতিবিধি হাতেনাতে ধরা পড়ে। প্রাথমিক বিভাগীয় তদন্তে প্রমাণিত হয় যে, তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি ত্রাণের আড়ালে কোটি টাকার ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া পণ্য পাচারের চেষ্টা করছিলেন।
এদিকে কাস্টমসের একটি অসাধু চক্র সরকারি গুদাম থেকে কাভার্ডভ্যানে করে বড় একটি চোরাচালান বের করে নিয়ে যাচ্ছে— এমন অত্যন্ত নিখুঁত ও গোপন সংবাদ পায় জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা । এনএসআই-এর দেওয়া সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর একটি বিশেষ ফাইটিং টিম ওই রাতেই বেনাপোল বাজারের কৌশলগত দুর্গাপুর মোড় এলাকায় ওত পেতে থাকে। কাভার্ডভ্যানটি ওই এলাকা অতিক্রম করার সময় বিজিবি সেটিকে অবরুদ্ধ করে আটক করে।
পরবর্তীতে বিজিবি ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা কাভার্ডভ্যানের সিলগালা ভেঙে ভেতরে তল্লাশি চালাতেই চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। গাড়ির ভেতর সরকারি অনুমোদিত কম্বলের স্তূপের নিচে লুকানো অবস্থায় রাজকীয় চোরাচালানের সন্ধান মেলে। সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় শুল্ক ফাঁকি দেওয়া অত্যন্ত দামী ৬ হাজার ৮টি ভারতীয় শাড়ি, ৬৩টি আধুনিক থ্রি-পিস, ৩৮৬টি কম্বল, ২০৮টি চাদর, ৮টি ওড়না এবং কসমেটিক্স বাণিজ্যের বিশাল স্তূপসহ মোট ৩৩ হাজার ২২২টি বিভিন্ন ধরনের কসমেটিক্স সামগ্রী। কাস্টমস ও বিজিবির যৌথ মূল্যায়ন কমিটি নিশ্চিত করেছে যে, জব্দকৃত এই রাজকীয় চোরাচালানের আনুমানিক বর্তমান বাজারমূল্য সর্বমোট ২ কোটি ৬৭ লাখ ৬৫ হাজার ৩১০ টাকা।
কাভার্ডভ্যান থেকে বিপুল পরিমাণ এই অবৈধ পণ্য উদ্ধারের পরপরই বিজিবি চোরাচালানের মালামাল পরিবহনের সরাসরি দায়িত্বে থাকা কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ মুখার্জী, কাভার্ডভ্যানের চালক মহসিন আলী ও হেলপার জাহিদ হাসানকে হাতেনাতে আটক করে নিরাপদ হেফাজতে নেয়। জানা গেছে, ত্রাণ ভাণ্ডারে পাঠানোর জন্য সরকার কর্তৃক অনুমোদিত যে চালানের কাগজ তৈরি করা হয়েছিল, তার তুলনায় গাড়িটিতে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে কয়েকগুণ অতিরিক্ত দামি মালামাল গোপনে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং এই পুরো লজিস্টিকস ও স্কোয়াড পার করার দায়িত্বে ছিলেন খোদ ইন্দ্রজিৎ মুখার্জী।
এই চাঞ্চল্যকর চুরির ঘটনা ও পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বরখাস্তের বিষয়টি সংবাদমাধ্যমের কাছে সরাসরি নিশ্চিত করেছেন বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার রাহাত হোসেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘সরকারি ত্রাণের পণ্যের আড়ালে এই ধরনের জালিয়াতি ও চোরাচালানের চেষ্টা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। ঘটনাটি তদন্তের জন্য উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করে নিখুঁতভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অপরাধে প্রাথমিকভাবে জড়িত থাকার ও দায়িত্বে অবহেলার জোরালো প্রমাণ মেলায় দুই সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ও তিন সিপাইকে জরুরি আদেশে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর কাস্টমসের আইন ও সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী জড়িতদের বিরুদ্ধে স্থায়ী বরখাস্তসহ কঠোর ফৌজদারি ও বিভাগীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ কাস্টমসের ঘরের শত্রুদের এমন জঘন্য কাণ্ড ফাঁসের পর পুরো বেনাপোল বন্দর ও কাস্টমস পাড়ায় চরম আতঙ্ক ও তোলপাড় বিরাজ করছে। ফাইল ছবি সংগৃহীত।

