স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
যশোরের সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীক মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র এখন নিজেই যেন ‘রোগাক্রান্ত’। দীর্ঘ সময় ধরে একজন মাত্র অ্যানেস্থেশিয়া চিকিৎসকের অভাবে এখানে অস্ত্রোপচার বা সিজারিয়ান সেবা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে রোগীদের সংখ্যাও কমতে কমতে এখন তা তলানিতে। সংশ্লিষ্টদের দাবি কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে, সহসাই সমস্যার সমাধান হবে।
একসময় যে প্রসূতি হাসপাতালে তিল ধারণের জায়গা থাকতো না, সেখানে এখন বিরাজ করছে সুনসান নীরবতা। গত ৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে যশোর মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে অ্যানেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞ বা অজ্ঞান করার চিকিৎসক নেই। আর এই একজন চিকিৎসকের অভাবেই স্থবির হয়ে পড়েছে হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ সব কার্যক্রম। হাসপাতালের শয্যাগুলো সাজিয়ে গুছিয়ে রাখলেও কাঙ্খিত রোগীর দেখা মিলছে না। তারপরও হাসপাতালে যারা আসছেন তাদের অধিকাংশ আবার ফিরে যাচ্ছেন। অপেক্ষাকৃত গরিব ও মধ্যবিত্ত যেসব রোগীরা ভর্তি হচ্ছেন তারা ভয় ও শংকার মধ্য দিয়ে সেবা নিচ্ছেন। রোগী ও সেবিকাদের দাবি অ্যানেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞের পদটি পূরণ হলে আবার প্রাণ ফিরে পেত এ প্রতিষ্ঠানটি।
নাজমা বেগম নামে এক রোগী বলেন, এ হাসপাতালের সেবার মান খুব ভালো। এ কারণে এখানে ভর্তি হয়েছি। গত রবিবার সকালে ভর্তি হই। নরমাল ডেলিভারি হওয়ার জন্যই এখানে আসা। তো অবশেষে আমার নরমাল ডেলিভারি হয়েছে। তারপরও একটু ভয়ের কারণ ছিল এখানে সিজারের কোন ব্যবস্থা নেই। যদি নরমাল ডেলিভারি না হতো তাহলে সমস্যায় পড়তে হতো। তাই এ হাসপাতালে যদি সিজারের সুবিধা থাকতো তাহলে ভালো হতো। আরও বেশি রোগী আসতো।
জাহানারা বেগম নামে এক রোগীর স্বজন বলেন, আমার সন্তানও এই হাসপাতালে হয়েছে। এক সময় এখানে নরমাল ডেলিভারির পাশাপাশি সিজারিয়ান অপারেশন হতো। কিন্তু এবার এসে দেখলাম সিজারের সুবিধা নেই। আমার রোগীর ডেলিভারির সময় একটু সমস্যা হয়েছে। আমরা ভয় পেয়েছিলাম। রোগীও ছোট মানুষ। যদি এ জায়গায় অপারেশনের ব্যবস্থা থাকত, তাহলে ভয় থাকত না।
হাসপাতালের সেবিকা রিতা হালদার বলেন, যখন সিজার চালু ছিল তখন আমাদের প্রচুর রোগী হতো। সিজার বন্ধ হওয়ায় রোগী কমছে। সিজার হবে না বলে তারা খুব আশঙ্কায় থাকে এবং ভয় পায় যে নরমাল যদি না হয় সেক্ষেত্রে আমরা কোথায় যাব। সেই কারণে রোগী আসলেও আবার এখান থেকে চলে যায়। এরপরও যেসব রোগী থাকে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করি যেন নরমাল ডেলিভারি হয়।
সেবিকা শিরিনা খাতুন বলেন, দেখেন কি সুন্দর করে বেড সাজায় নিয়ে বসে আছি। কিন্তু রোগী আমাদের কাছে আসতে পারছে না। যখনই আমরা চেকআপে যাচ্ছি, দেখছি তারা একটা কথাই সবসময় বলে, ‘আপনাদের কি সিজার করার ব্যবস্থা আছে?’ আমরা যতই বুঝাই না কেন, রোগীদের ওই একটাই কথা, ‘আপনাদের অপারেশন হবে? যদি কোনো একটা সমস্যা দেখা দেয়, শেষ সময় কি আপনারা সিজার করতে পারবেন?’
কিছুই বলার নেই, আমরা হা করে রোগীর মুখের দিকে তাকায় থাকি। আমাদের ডাক্তার ম্যামও মাঝে মাঝে রোগীদের প্রশ্নের চাপে হতভম্ব হয়ে যায়। মনে হয় কি আমরা কিসের জন্য বসে আছি ? আমরা এত সুন্দর করে রোগীগুলা দেখি, যত্ন করি। কেবল সিজারিয়ান অপারেশনের ব্যবস্থা না থাকায় অনেক রোগী কমে গেছে।
সিজার যদি না থাকে একটা প্রতিষ্ঠানে, কোনো রোগী আসবে না। এ অবস্থায় আমাদের অবশ্যই একজন অ্যানেস্থেসিয়া ডাক্তার খুবই দরকার। এ পদটি পূরণ হলে আবারও রোগী বাড়বে।
এ বিষয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ সাদিয়া রহমান বলেন, অ্যানেস্থেসিয়া চিকিৎসকের পদটি পূরণের জন্য কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। আমাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে। সহসাই সমস্যার সমাধান হবে বলে তারা আশাবাদী। হাসপাতালের দেয়া তথ্য মতে, অ্যানেস্থেশিয়া চিকিৎসক থাকাবস্থায় বছরে সহস্রাধিক রোগীকে সেবা দেয়া সম্ভব হতো। যা এখন অর্ধেকে নেমে এসেছে। ছবি সংগৃহীত।

