‘বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ নজরুল, তাঁকে খণ্ডিতভাবে উপস্থাপন অন্যায়’: ১২৭তম জন্মবার্ষিকীতে দুই বাংলার গবেষকদের ঐক্যের সুর

‘বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ নজরুল, তাঁকে খণ্ডিতভাবে উপস্থাপন অন্যায়’: ১২৭তম জন্মবার্ষিকীতে দুই বাংলার গবেষকদের ঐক্যের সুর

স্ফুলিঙ্গ  রিপোর্ট :

বিশ্বসাহিত্যের এক অনন্য ও অবিনশ্বর দীপশিখা, সাম্যের গান ও চেতনার বাতিঘর জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্মকে বিশ্বমঞ্চে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে তা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ভাষায় অনুবাদের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার জোরালো দাবি জানিয়েছেন দুই বাংলার বিশিষ্ট নজরুল গবেষক ও শিক্ষাবিদরা। বিশ্বসাহিত্যে বিরাট এক সম্পদ ও বাংলা ভাষার সৌভাগ্যের প্রতীক কবি নজরুল ইসলামকে কোনো সুনির্দিষ্ট বৃত্তে বা খণ্ডিতভাবে উপস্থাপনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বক্তারা বলেন, সমগ্র নজরুলকে সামগ্রিকভাবে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে না পারলে তা সাহিত্যের প্রতি চরম অবিচার হবে। আজ সোমবার (২৫ মে) রাত ৯টায় দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় সাহিত্য সংগঠন ‘বিদ্রোহী সাহিত্য পরিষদ’ (বিএসপি) কর্তৃক জুম প্ল্যাটফর্মে আয়োজিত কবি নজরুলের ১২৭তম শুভ জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ‘নজরুল ইসলাম জীবনী ও কাব্যভাবনা’ শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক ভার্চুয়াল আলোচনাসভায় বিশ্ববরেণ্য আলোচকরা এসব তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন। মে মাসের এই বিশেষ সাহিত্যলগ্নে আয়োজিত সেমিনারটি দুই বাংলার কবি, সাহিত্যিক ও নজরুলপ্রেমীদের মাঝে এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন ও নতুন চেতনার সৃষ্টি করেছে।

আন্তর্জাতিক এই সেমিনারে প্রধান আলোচক হিসেবে অত্যন্ত তথ্যবহুল বক্তব্য উপস্থাপন করেন বাংলাদেশের ময়মনসিংহের ত্রিশালে অবস্থিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাককানবি) ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক, বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ড. শেখ মেহেদী হাসান। কবি নজরুলকে খণ্ডিতভাবে ব্যবহারের চলমান অপচেষ্টার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, “আজকের সমাজে নজরুলকে কেউ কেউ কেবল ইসলাম ধর্মের কবি, কেউ হিন্দু ধর্মের কবি, আবার কেউ কেউ নারী জাগরণ, বিদ্রোহী, জাতিসত্তা, প্রেম কিংবা নিছক গানের কবি হিসেবে খণ্ডিতভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন, যা মোটেও সমুচিত হচ্ছে না। সমগ্র নজরুল ইসলামকে তাঁর সৃষ্টির বিশালত্বসহ সামগ্রিকভাবে উপস্থাপন করতে হবে। নতুবা তাঁর প্রতি এবং বাংলা সাহিত্যের প্রতি চরম অবিচার করা হবে।” তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, নজরুল ইসলাম বিশ্বসাহিত্যের এক অমূল্য ও অফুরন্ত সম্পদ। এই সম্পদকে আজকের ক্ষয়িষ্ণু সমাজ বিনির্মাণে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে তবেই এ সাম্যহীন সমাজ থেকে মানুষের মুক্তি মিলবে এবং ইতিহাসের দায় মোচন হবে।

অনুষ্ঠানের অন্যতম মুখ্য আলোচক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট শিক্ষক ও গবেষক মীম মিজান নজরুলের বৈচিত্র্যময় জীবনের ওপর গভীর আলোকপাত করে বলেন, নজরুল ইসলাম এক চরম বৈচিত্র্যময় ও ঝোড়ো জীবনের অধিকারী ছিলেন, যা সবার জানা। তবে এই বৈচিত্র্যময় জীবনের আড়ালে কবিতায় প্রতিবাদী ও সাম্যবাদী হওয়ার গল্পটাও বেশ বিস্ময়কর। তাঁর কাব্যভাবনায় বা দর্শনে একদিনেই প্রতিবাদ বা বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠেনি এবং সমাজের অবহেলিত-বঞ্চিত মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দেখে তাঁর মনটা একদিনেই চরম প্রতিবাদী হয়ে ওঠেনি; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ এক পারিপার্শ্বিক অভিজ্ঞতা ও দ্রোহের ইতিহাস।

সেমিনারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলের কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট গবেষক ড. Rajesh Kar (রাজেশ কর) পশ্চিমবঙ্গের রানীগঞ্জ থেকে নজরুলের বিদ্রোহী সত্তা জাগ্রত হওয়ার নানামুখী ঐতিহাসিক তথ্যাদি উপস্থাপন করেন। তিনি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, কবি নজরুল ইসলাম ত্রিশাল থেকে পশ্চিমবঙ্গের রানীগঞ্জ স্কুলে এসে সরাসরি অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলেন। এখানে দুই বছর অবস্থানকালেই মূলত তাঁর ভেতরের সুপ্ত বিদ্রোহী সত্তা ও কাব্যিক প্রতিভা জাগ্রত হয়েছে বলে বহু গবেষক ও দলিল প্রমাণ করে। রানীগঞ্জের এই মাটিতে অবস্থানকালেই তিনি প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়মিতভাবে কবিতা লিখতে শুরু করেন, যার প্রতিটি পঙক্তিই ছিল মূলত শোষণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদী ও দ্রোহে ভরা।

অনুষ্ঠানে বিশেষ সম্মানিত অতিথি হিসেবে কলকাতার প্রখ্যাত সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ছায়ানট’-এর সভাপতি, আন্তর্জাতিক নজরুল গবেষক ও প্রথিতযশা নজরুল সঙ্গীত শিল্পী সোমঋতা মল্লিক অংশ নিয়ে কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলা ভাষার পরম সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে অত্যন্ত আবেগপূর্ণ ও জোরালো আহ্বান জানিয়ে বলেন, “নজরুলের কালজয়ী প্রতিভা ও দর্শন নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও বেশি বেশি গবেষণাধর্মী কাজ করা প্রয়োজন। তাঁর সমৃদ্ধ সাহিত্যকে যত বেশি বিশ্বময় ছড়িয়ে দেওয়া যাবে এবং যত বেশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ভাষায় এর মানসম্মত অনুবাদ করা যাবে, ততই তাঁর দর্শন সম্পর্কে বিশ্ববাসী জানতে পারবেন।” তিনি আরও বলেন, নজরুলকে কেবল বাঙালি বা আঞ্চলিক কবি হিসেবে নয়, বরং বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে তাঁর প্রতিভার উন্মোচনের দাবি রাখে বর্তমান সময়। এই মহান ও যুগান্তকারী কাজটি সম্পন্ন করতে বাংলাদেশ ও ভারতের সরকারি এবং বেসরকারি উভয় পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোকে একযোগে অত্যন্ত জরুরি ভিত্তিতে এগিয়ে আসার উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি। বিদ্রোহী সাহিত্য পরিষদের শীর্ষ নেতৃত্বের সমাপনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে এই বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ওয়েবিনারটির সফল সমাপ্তি ঘটে। ছবি সংগৃহীত।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *