স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
যশোরের শার্শা উপজেলা বাজারে যাওয়ার পথে পূর্ব শত্রুতার জেরে ট্যুরিস্ট পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত এক পুলিশ সদস্যকে লোহার পাইপ, রড ও কোদাল দিয়ে পিটিয়ে নৃশংসভাবে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে শার্শা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা কামাল মিন্টুসহ ছয়জনের নাম উল্লেখ করে থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। গত ৪ জুন (বৃহস্পতিবার) আহত পুলিশ সদস্যের ছোট ভাই মেহেদী হাসান রয়েল বাদী হয়ে শার্শা থানায় এই চাঞ্চল্যকর মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় নামধারী ৬ আসামির পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ৫ থেকে ৬ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার অন্য এজাহারনামীয় আসামিরা হলেন—প্রধান আসামি মোস্তফা কামাল মিন্টুর দুই ভাই লাল্টু হোসেন ও পিন্টু হোসেন, আব্দুস সালামের দুই ছেলে সুজন হোসেন ও সবুজ হোসেন এবং মৃত আলাউদ্দীনের ছেলে টিটন হোসেন। একজন কর্মরত পুলিশ সদস্যের ওপর নিজ এলাকায় এমন বর্বরোচিত হামলার খবর প্রকাশ পাওয়ায় পুরো সীমান্ত অঞ্চল জুড়ে ব্যাপক তোলপাড় ও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
মামলার আনুষ্ঠানিক এজাহার ও ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা গেছে, পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে ঢাকা থেকে ছুটি নিয়ে শার্শার নিজ বাড়িতে এসেছিলেন ট্যুরিস্ট পুলিশের নায়েক পদে কর্মরত মামুন হাসান। গত ২৯ মে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তিনি মোটরসাইকেল যোগে শার্শা বাজারে যাওয়ার পথে শ্যামলাগাছি গ্রামের একটি স্থানীয় চায়ের দোকানের সামনে পৌঁছালে আসামিরা অতর্কিতভাবে তাঁর গতিরোধ করেন। এ সময় পূর্ব শত্রুতার জের ধরে তারা মামুনকে উদ্দেশ্য করে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করেন। মামুন হাসান এই অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ জানালে উপজেলা বিএনপি নেতা মোস্তফা কামাল মিন্টুর সুনির্দিষ্ট নির্দেশে অন্য আসামিরা তাঁর ওপর সঙ্ঘবদ্ধভাবে চড়াও হয়ে মারধর শুরু করেন। একপর্যায়ে মিন্টু নিজে একটি ভারী লোহার পাইপ দিয়ে মামুনের মাথায় সরাসরি আঘাতের চেষ্টা চালালে তিনি জীবন বাঁচাতে হাত দিয়ে তা ঠেকান; এতে তাঁর বাম হাত ও বৃদ্ধাঙ্গুলিতে গভীর জখম হয়। পরবর্তীতে মাথায় শক্ত লাঠির আঘাত পেয়ে মামুন রাস্তার ওপর জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেলে আসামিরা লোহার পাইপ, কোদাল ও লোহার রড দিয়ে তাঁর দুই পায়ে নৃশংসভাবে উপর্যুপরি আঘাত করেন, যার ফলে তাঁর মাথা ও দুই হাঁটুতে গুরুতর হাড়ভাঙা জখম হয়। এ সময় মামুন হাসানকে রক্ষা করতে তাঁর ফুফা আব্দুর বারীক দ্রুত এগিয়ে এলে আসামিরা তাকেও বেদম মারধর করে এবং একপর্যায়ে মামুনের গলা চেপে ধরে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা চালায়। এছাড়া হামলার চূড়ান্ত মুহূর্তে সুযোগ বুঝে আসামি টিটন হোসেন আহত পুলিশ সদস্যের পকেটে থাকা নগদ ৭ হাজার ৫০০ টাকা জোরপূর্বক ছিনিয়ে নিয়ে যান বলে এজাহারে সরাসরি অভিযোগ করা হয়েছে। ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন ও পুলিশ রক্তাক্ত আহতদের মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে দ্রুত শার্শা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন এবং সেখানে দীর্ঘ চিকিৎসা ও পারিবারিক সিদ্ধান্ত শেষে এই মামলাটি রুজু করা হয়।
এদিকে, তাঁর বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট দাবি করে অভিযুক্ত বিএনপি নেতা মোস্তফা কামাল মিন্টু বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জেরে স্থানীয় বিএনপির একটি প্রভাবশালী পক্ষ তাঁকে সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে ফাঁসাচ্ছে। তিনি পাল্টা দাবি করেন, আহত পুলিশ সদস্য মামুন হাসান নিজে সরাসরি নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত এবং তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যরা বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে এলাকায় চরম ত্রাস সৃষ্টি করে রেখেছিলেন। মিন্টু আরও উল্লেখ করেন, এই ঘটনার পর প্রথমে থানায় যে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছিল, সেখানে তাঁর কোনো নাম ছিল না; পরবর্তীতে তাঁকে রাজনৈতিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করতেই এই কাল্পনিক মামলা সাজানো হয়েছে, কারণ তিনি আসন্ন শার্শা উপজেলা পরিষদের একজন শক্তিশালী চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী।
অন্যদিকে, সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে শার্শা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মামুন হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, মামলা দায়েরের পরপরই থানা পুলিশ এবং জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) একটি যৌথ দল প্রধান আসামি মিন্টুকে গ্রেফতারের জন্য তাঁর এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে। তবে পুলিশ পৌঁছানো মাত্রই সেখানে আসামিপক্ষের লোকজন দ্বারা একটি কৃত্রিম ‘মব’ বা গণবিক্ষোভের সৃষ্টি করা হয়, যার ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় সাময়িকভাবে মিন্টুকে আটক করা সম্ভব হয়নি। পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় থানায় একটি নতুন সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে এবং পুলিশ সদস্যকে হত্যাচেষ্টা মামলার সকল পলাতক আসামিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে হাতেনাতে গ্রেফতার করতে জেলা পুলিশ ও ডিবির সাঁড়াশি অভিযান রাজপথে জোরদারভাবে অব্যাহত রয়েছে। ফাইল ছবি সংগৃহীত।

