ঝিকরগাছা থেকে ফিরে বিশেষ প্রতিনিধি :
যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার পানিসারা ইউনিয়নে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা কুখ্যাত সুদখোর, চাঁদাবাজ ও কিশোর গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষক আব্দুল মমিনের অন্ধকার সাম্রাজ্যের আরও বহু চাঞ্চল্যকর ও রোমহর্ষক অধ্যায় উন্মোচিত হয়েছে। ‘স্ফুলিঙ্গ’-এ এর আগে মমিনের সুদের জাল ও গোলাম মোর্তজাকে কুপিয়ে হত্যার হুমকির খবর প্রকাশের পর এবার ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ মুখ খুলতে শুরু করেছেন। সাইকেল দোকানের আড়ালে চড়া সুদের ব্যবসা, দুই স্ত্রী ও চার সন্তান থাকার পরও ঋণগ্রহীতাদের বাড়ির মা-বোনদের ওপর কুদৃষ্টি এবং থানা পুলিশকে ম্যানেজ করে পুরো পানিসারা অঞ্চলকে এক আতঙ্কের জনপদে পরিণত করেছে এই মমিন ও তার গ্যাং।
এই মমিন এতই দুর্ধর্ষ যে এই প্রতিবেদক এলাকায় যেয়ে তার সাথে দেখা করার সাহস পাননি। একাধিক এলাকাবাসী জানান, “ভাই মমিন যদি জানতে পারে আপনি তার বিরুদ্ধে তথ্য সংগ্রহ করতে এলাকায় এসেছেন তাহলে আপনি আর নাও ফিরতে পারেন। সে তার কিশোর বাহিনী দিয়ে আপনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে”। মমিনের এলাকায় কিছু লোক আছে। যারা সব সময় তার গুণগান গায়। মমিন তাদেরকে দিয়ে নিজেকে ভালো মানুষ হিসেবে জাহির করায়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঝিকরগাছার বর্ণি বাজারে আব্দুল মমিনের একটি সাইকেলের দোকান রয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে তাকে সাধারণ ব্যবসায়ী মনে হলেও এই দোকানের অন্তরালেই চলে কোটি কোটি টাকার অবৈধ চড়া সুদের কারবার। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সে প্রথমে এলাকার অসহায় ও দরিদ্র মানুষকে ছলে-বলে-কৌশলে ঋণের জালে আবদ্ধ করে। এরপর সুদের লভ্যাংশ চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়িয়ে লাখ লাখ টাকা বাণিজ্য করে। চড়া সুদের টাকা দিতে না পারায় ইতোমধ্যে বর্ণি ও আশেপাশের গ্রামের অন্তত ডজনখানেক পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে পুরোপুরি পথে বসেছে।
মমিনের বিরুদ্ধে আসা সবচেয়ে গুরুতর ও স্পর্শকাতর অভিযোগটি হলো— তার ঘরে দুই স্ত্রী এবংচারজন সন্তান থাকা সত্ত্বেও সে লম্পট ও বিকৃত মানসিকতার পরিচয় দিচ্ছে। সুদের টাকা আদায়ের নাম করে মমিন ও তার গ্যাংয়ের সদস্যরা ওত পেতে থাকে। যখন কোনো বাড়ির পুরুষেরা মাঠে বা কাজে যান এবং বাড়ি পুরুষশূন্য থাকে, ঠিক তখন মমিন টাকা আদায়ের অজুহাতে ঘরে ঢুকে পরিবারের নারীদের ওপর অতি কুদৃষ্টি দেয় এবং রসিকতার নামে অশালীন আপত্তিকর মন্তব্য করেন এবং বিভিন্ন রকম অশালীন আকার ইঙ্গিত দিয়ে থাকেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এলাকার প্রভাবশালী ও দুর্ধর্ষ কিশোর গ্যাংয়ের লিডার হওয়ায় মান-সম্মানের ভয়ে এবং প্রাণনাশের আতঙ্কে অসহায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলো এতদিন মুখ খুলতে সাহস পায়নি।
মমিনের এই পুরো অপরাধ সাম্রাজ্য ও কিশোর গ্যাং পরিচালনার প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে তার আপন ভাতিজা সাগর। এই সাগর বর্ণি বাজার ও তালতলা এলাকায় একদল বখাটে কিশোরকে নিয়ে ‘মমিন বাহিনী’ বা ‘কিশোর গ্যাং’ নিয়ন্ত্রণ করে। এই বাহিনীর অত্যাচারে পানিসারার সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ। স্কুল-কলেজগামী ছাত্রীদের প্রতিনিয়ত উত্ত্যক্ত ও ইভটিজিং করা থেকে শুরু করে এলাকার নানাবিধ সমাজবিরোধী ও মাদকসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে লিপ্ত রয়েছে সাগরের এই টিনেজ গ্যাং। যারা মমিনের সুদের বিরুদ্ধে কথা বলে, তাদেরই এই কিশোর গ্যাং দিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার বা খুন করে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
সূত্র জানায়, মমিন অত্যন্ত চতুর এক রাজনৈতিক গিরগিটি। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে, তাদের ম্যানেজ করেই সে অপরাধ চালায়। গত ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মমিন রাতারাতি নিজেকে ‘বিএনপির সক্রিয় কর্মী’ হিসেবে দাবি করা শুরু করেছে। শুধু তাই নয়, বর্ণি গ্রামের মোজফ্ফর ও গোলাম মোর্তজার ওপর হামলা ও চাঁদা দাবির পর থানায় লিখিত অভিযোগ করা হলেও পুলিশ রহস্যজনক কারণে নীরব ভূমিকা পালন করছে। অভিযোগ রয়েছে, মমিন তার সুদের কালো টাকা এবং অবৈধ বাণিজ্যের জোরে পুলিশের একটি অংশকে ‘বিশেষ কায়দায়’ ম্যানেজ করে রেখেছে। যার কারণে মামলা রেকর্ড না করে উল্টো ভুক্তভোগীদের সাথে আপসের নামে কালক্ষেপণ করছেন তদন্ত কর্মকর্তা। উপরন্তু, থানায় অভিযোগ করার পর থেকে গোলাম মোর্তজাসহ অন্য ভুক্তভোগীদের বিভিন্ন কৌশলে ভয়ভীতি ও প্রতিনিয়ত হয়রানি করা হচ্ছে বলে খবর মিলেছে।
এসব নতুন ও চাঞ্চল্যকর অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি আব্দুল মমিনের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সে সুদের ব্যবসার কথা স্বীকার করে নিজেকে ইউনিয়ন বিএনপির সেক্রেটারির ঘনিষ্ঠ লোক পরিচয় দিয়ে মমিন ‘স্ফুলিঙ্গ’-কে বলে, “আমি বাজারে সুদে টাকা খাটানোর ব্যবসা করি ঠিকই, তবে নারীদের কুদৃষ্টি দেওয়া বা কিশোর গ্যাং পোষার অন্য সব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা আমাকে ফাঁসাতে এসব করাচ্ছে।”
এদিকে, মমিন মাফিয়ার এমন লাগামহীন অপরাধ, চাঁদাবাজি এবং নিরীহ পরিবারগুলোকে হয়রানির করার ঘটনায় পানিসারা ইউনিয়নের সাধারণ জনগণের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। পুলিশ প্রশাসনের প্রতি আস্থা হারিয়ে ভুক্তভোগী এলাকাবাসী ও সচেতন মহল এবার ঝিকরগাছা থানার সদ্য যোগদানকৃত নতুন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সরাসরি হস্তক্ষেপ ও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। সাধারণ মানুষের দাবি, কোনো দলীয় পরিচয় বা টাকার জোড়ে যেন এই রক্তচোষা মমিন ও তার ভাতিজা সাগর পার পেয়ে না যায়। (চলবে)


