রফিক মন্ডল, বিশেষ প্রতিনিধি (কোটচাঁদপুর, ঝিনাইদহ) :
ভোর চারটার ঘন কুয়াশা আর অন্ধকারের চাদর ভেদ করে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার হরিন্দিয়া গ্রামের মেঠোপথ ধরে প্রতিদিন মসজিদের দিকে ছুটে চলেছে একদল কিশোর ও তরুণ। চোখে তাদের ঘুম জড়ানো অলসতা নেই, বরং রয়েছে এক অনন্য প্রতিযোগিতায় জেতার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। গত দুই মাস ধরে এই গ্রামে চলেছে এক নীরব ও সুন্দর ‘নামাজ যুদ্ধ’, যার লক্ষ্য ছিল একটাই—যেকোনো মূল্যে টানা ৬০ দিন, ৫ ওয়াক্ত নামাজ জামায়াতের সাথে আদায় করা! আজকের তরুণ প্রজন্মকে ফেসবুক-টিকটকের আসক্তি, মাদক ও নৈতিক অবক্ষয় থেকে টেনে এনে মসজিদের শীতল ছায়ায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে এই ব্যতিক্রমী প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল স্থানীয় সামাজিক সংগঠন ‘মাদ্রাসা পড়া যুব উন্নয়ন সংঘ’।
টানা দুই মাসের এই কঠিন ও ধৈর্যের পরীক্ষায় শেষ পর্যন্ত সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছেন ১৩ জন অপরাজেয় তরুণ। তাদের এই অনন্য সাফল্যকে উদযাপন করতে গতকাল শুক্রবার (২৯ মে, ২০২৬) বিকেলে হরিন্দিয়া মাদ্রাসা মাঠে এক জাঁকজমকপূর্ণ পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিল প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারী তিন তরুণ—আলিফ, আব্দুল্লাহ এবং আমির হামজা। যখন মঞ্চে বিজয়ী হিসেবে তাদের নাম ঘোষণা করা হচ্ছিল, তখন পুরো মাঠ করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে। পুরস্কার হিসেবে এই তিনজনের হাতে তুলে দেওয়া হয় ঝকঝকে তিনটি নতুন বাইসাইকেল।
নতুন বাইসাইকেল ছুঁয়ে দেখার মুহূর্তে বিজয়ী এক তরুণ আবেগাপ্লুত হয়ে বলে, “পুরস্কার পাবো কি পাবো না, সেটা বড় কথা ছিল না। সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো, এই ৬০ দিনে আমাদের ফজরের নামাজে ওঠার যে নিয়মিত অভ্যাস তৈরি হয়েছে, তা হয়তো আমাদের সারা জীবন থেকে যাবে।” প্রতিযোগিতায় সফল বাকি ১০ জন যোদ্ধাকেও খালি হাতে ফেরানো হয়নি; তাদের প্রত্যেকের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে আলোর দিশারী পবিত্র আল-কুরআন এবং জীবন গড়ার নানা শিক্ষণীয় ইসলামী বই।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) সাবেক মেধাবী ছাত্র ও বিশিষ্ট সমাজসেবক আতিকুর রহমানের সভাপতিত্বে এবং মাসুম বিল্লাহর সঞ্চালনায় এই মহতী অনুষ্ঠানে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। অতিথিদের তালিকায় ছিলেন আল মামুন বাবু, দেলোয়ার হোসেন সাইদী, আ. মালেক, আ. মজিদ মিয়া এবং সোহাগ আহমেদসহ আরও অনেকে। অনুষ্ঠানে আগত বক্তারা আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, যেখানে আজকের আধুনিক সমাজ তরুণদের মোবাইল আসক্তি আর গ্যাং কালচার নিয়ে চরম চিন্তিত, সেখানে হরিন্দিয়া গ্রামের এই উদ্যোগ পুরো দেশের জন্য একটি পথপ্রদর্শক। একটি সুস্থ, মাদকমুক্ত ও সুন্দর সমাজ গঠনে দেশের প্রতিটি গ্রামেই এখন এমন চমৎকার উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। বিকেল গড়িয়ে যখন সন্ধ্যা নামছিল, তখন নতুন সাইকেলের বেল বাজিয়ে বিজয়ের আনন্দ নিয়ে ঘরে ফিরছিল আলিফ-আব্দুল্লাহরা, যা পুরো কোটচাঁদপুর এলাকায় এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে। ছবি সংগৃহীত।

