স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
যশোর-বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে স্বর্ণ পাচার ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ এবং তা নিয়ে পাল্টা-পাল্টি মামলায় সরগরম হয়ে উঠেছে যশোরের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গন। এক পক্ষ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে অভিযোগ দিলেও অপর পক্ষ একে ‘বহিষ্কৃত নেতার অপপ্রচার’ হিসেবে দেখছে। বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে শহরজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
এসকান্দার আলী জনির অভিযোগ:
নিজেকে যশোর জেলা যুবদলের প্রচার সম্পাদক দাবি করে মো. এসকান্দার আলী জনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তার দাবি, শার্শা উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম শহীদ ওরফে গোল্ড শহীদ, যশোর জেলা যুবদলের সদস্য সচিব আনসারুল হক রানা এবং মাগুরা জেলা যুবদলের সভাপতি ওয়াসিকর রহমান কল্লোলের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট স্বর্ণ পাচার ও মাদক ব্যবসায় জড়িত। জনি অভিযোগে উল্লেখ করেন, এই চক্রের প্রতিবাদ করায় তার বিরুদ্ধে গত ৭ এপ্রিল সাইবার সুরক্ষা আইনে দুটি ‘মিথ্যা মামলা’ করা হয়েছে।
জেলা যুবদলের পাল্টা বক্তব্য:
অভিযোগের বিষয়ে যশোর জেলা যুবদলের সদস্য সচিব আনসারুল হক রানার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, “এসকান্দার আলী জনি বর্তমানে যুবদলের কেউ নন। দলীয় নীতি পরিপন্থী ও শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকায় কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে অনেক আগেই দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর থেকেই তিনি মরিয়া হয়ে আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছেন।”
রানা আরও বলেন, “তিনি (জনি) যদি কোনো অভিযোগ করে থাকেন, তবে তদন্তেই সব সত্য বেরিয়ে আসবে। আমরা এতে মোটেও বিচলিত বা চিন্তিত নই। সত্য কখনো চাপা থাকে না।”
বর্তমান পরিস্থিতি:
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জনি নিজেকে এখনো পদধারী দাবি করলেও দলীয় সূত্রগুলো তার বহিষ্কারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সীমান্তে অবৈধ ব্যবসা এবং রাজনৈতিক আধিপত্য নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ এখন প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে। একদিকে স্বর্ণ পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ, অন্যদিকে দলীয় কোন্দল ও পাল্টা-পাল্টি মামলা— সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
১২/৪/২৬ তারিখের অভিযোগে যা বলেছেন জনি
লিখিত আবেদনে এসকান্দার আলী জনি বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন: শহিদুল ইসলাম শহীদ ওরফে গোল্ড শহীদ: (যুগ্ম আহ্বায়ক, শার্শা উপজেলা যুবদল)। তাকে স্বর্ণ চালানের মূল হোতা ও গডফাদার হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এছাড়াও আনসারুল হক রানা (সদস্য সচিব, যশোর জেলা যুবদল),ওয়াসিকর রহমান কল্লোল (সভাপতি, মাগুরা জেলা যুবদল)এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
আবেদনকারীর দাবি, এই চক্রটি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে যশোর-বেনাপোল রুটকে স্বর্ণ পাচারের নিরাপদ করিডোর হিসেবে ব্যবহার করছে। সীমান্তের বিভিন্ন দুর্বল পয়েন্ট দিয়ে সোনা দেশে নিয়ে আসার পর ব্যক্তিগত গাড়ি ও কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হয়। এর মাধ্যমে অর্জিত বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার করে তারা অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন। সম্প্রতি যশোর কোতোয়ালি থানা কর্তৃক উদ্ধার হওয়া একটি প্রাইভেট কারের ঘটনায় এই চক্রের পাচার পদ্ধতির চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
এসকান্দার আলী জনি জানান, গত ০৬/০৪/২০২৬ তারিখে তিনি এই চক্রের বিরুদ্ধে মিডিয়াতে সোচ্চার হলে এবং প্রতিবাদ করলে ক্ষিপ্ত হয়ে চক্রটি তাকে দমনে নানা চক্রান্ত শুরু করে। তার দাবি, কোতোয়ালি থানা পুলিশকে ম্যানেজ করে ০৭/০৪/২০২৬ তারিখে এ.কে আজাদ তমাল এবং মো. আনসারুল হক রানা বাদী হয়ে তার বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনে দুটি ‘মিথ্যা মামলা’ (মামলা নং- ২৫ ও ২৬) দায়ের করেছেন।
নিজে একজন দীর্ঘদিনের জেল-জুলুমের শিকার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব দাবি করে এসকান্দার আলী জনি বলেন, এই প্রভাবশালী সন্ত্রাসী ও চোরাকারবারীদের গডফাদাররা তাকে এবং তার পরিবারকে খুনের হুমকি দিচ্ছে। তিনি জাতীয় স্বার্থে এই চক্রের বিরুদ্ধে একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করার জন্য প্রধানমন্ত্রী এবং দুদক চেয়ারম্যানের কাছে বিনীত অনুরোধ জানিয়েছেন। একই সাথে তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত ‘মিথ্যা মামলা’ প্রত্যাহারের ব্যবস্থা গ্রহণেরও আর্জি জানান তিনি।


