স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
ঐতিহ্যবাহী ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালস’-এর যশোর ডিপোকে কেন্দ্র করে একের পর এক আর্থিক কেলেঙ্কারি ও জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর খবর সামনে আসছে। এবার প্রতিষ্ঠানটির যশোর ডিপো ইনচার্জ মো. মুকুল হোসেনের বিরুদ্ধে নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন রেখে আপন চাচাতো ভাইয়ের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্র ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে চাকরি করার মতো গুরুতর জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। চাঞ্চল্যকর এই জালিয়াতির ঘটনা ফাঁসের পর ডিপোর কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ ও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
এই অনিয়মের বিষয়ে গত ৯ জুন ২০২৬ তারিখে ওই প্রতিষ্ঠানেরই বিতরণ সহকারী মো. শাহিন হোসেন প্রধান কার্যালয়ে একটি সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
দাখিলকৃত লিখিত অভিযোগ ও প্রশাসনিক সূত্র থেকে জানা গেছে, অভিযুক্ত ডিপো ইনচার্জ মো. মুকুল হোসেন (পিতা: মো. আমির আলী) নিজের আসল পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখেন। তিনি বর্তমানে ওমানপ্রবাসী তার আপন চাচাতো ভাই মো. রিপন হোসেনের নামে ইস্যু করা জাতীয় পরিচয়পত্র ও প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক নথিপত্র ব্যবহার করে গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালসে এই গুরুত্বপূর্ণ পদটি বাগিয়ে নেন। দীর্ঘদিন ধরে এই চরম জালিয়াতি চললেও স্থানীয় বা কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে কোনো কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেওয়ায় অফিসের ভেতরে এক ধরণের গুমোট পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, মুকুল হোসেনের এটিই প্রথম অপরাধ নয়। এর আগেও তাঁর বিরুদ্ধে অফিসের বিতরণ সহকারী লুৎফর রহমানের বেতন জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের মতো মারাত্মক অভিযোগ উঠেছিল। সেই সময় প্রধান কার্যালয় থেকে তাকে কারণ দর্শানোর (শো-কজ) নোটিশ দেওয়া হলে তিনি বরখাস্ত হওয়ার ভয়ে ২০২০ সালের ৫ নভেম্বর প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যবস্থাপক বরাবর লিখিতভাবে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন। ভবিষ্যতে এমন অপরাধ আর করবেন না বলে মুচলেকা দিয়ে সেবার তিনি চাকরি রক্ষা করেছিলেন।
অভিযোগকারী শাহিন হোসেন জানান, পূর্বের অপরাধ থেকে শিক্ষা নেওয়ার পরিবর্তে মুকুল হোসেনের অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার মাত্রা আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে। তাই অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে আসল অপরাধীকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন কর্মচারীরা।
পরিচয় জালিয়াতির এই নজিরবিহীন অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি যোগাযোগ করা হলে অভিযুক্ত মো. মুকুল হোসেন ঘটনার সত্যতা পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নেন। অত্যন্ত দায়সারা ও চাতুর্যের সুরে তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “ঘটনার যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। রিপন হোসেন নামে যে ব্যক্তি এখানে খাতাকলমে চাকরি করতেন, তাকে ইতিমধ্যে কর্তৃপক্ষ চাকরি থেকে ছাঁটাই (টার্মিনেট) করেছে।” তাঁর এমন বক্তব্য থেকে পরিষ্কার যে, তিনি জালিয়াতির মাধ্যমে চাকরি নেওয়ার বিষয়টি পরোক্ষভাবে মেনে নিয়েছেন।
এদিকে এই কেলেঙ্কারির বিষয়ে গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালস কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা সিদ্ধান্ত এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তবে কর্পোরেট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অভিযোগটি যদি তদন্তে শতভাগ প্রমাণিত হয়, তবে এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম নয়, বরং দেশের স্বনামধন্য একটি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ প্রক্রিয়া, ব্যাকগ্রাউন্ড ভেরিফিকেশন এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির কঙ্কালসার রূপটিকে বড় ধরণের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাবে। ছবি সংগৃহীত।


