স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
খুলনা মহানগরীর সোনাডাঙ্গায় প্রেমের সম্পর্ক ও পারিবারিক কলহের জেরে আরফানা হোসেন নির্জনা (১৬) নামে এক কিশোরীকে নিজ জন্মদাত্রী মা কর্তৃক অত্যন্ত নৃশংসভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করার লোমহর্ষক ও বর্বরোচিত কাহিনী উন্মোচিত হয়েছে। হত্যার পর মরদেহ প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে খুলনা সদর থানার প্রান্তিকা আবাসিক এলাকায় ফেলে দিয়ে ঘটনাটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছিল ঘাতক পরিবার।
তবে রেহাই মেলেনি। কেএমপি পুলিশের আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তি ও নিবিড় তদন্তের মুখে ঘটনার মাত্র ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে ঘাতক মা আরিফা ইয়াসমিন সিমা (৩৫)-কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আজ শনিবার (১১ জুলাই ২০২৬) খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) সদর দপ্তরে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ প্রেস ব্রিফিংয়ে এই ক্লু-লেস হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক রহস্য উন্মোচন করেন কেএমপি কমিশনার জনাব মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান, বিপিএম-সেবা।
প্রেস ব্রিফিং ও মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, গত ০৮ জুলাই ২০২৬ তারিখ রাত আনুমানিক ৯টার সময় খুলনা সদর থানাধীন প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার ৩ নম্বর রোডে একটি পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বস্তাবন্দি অবস্থায় অজ্ঞাতনামা এক কিশোরীর মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেয়। সদর থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করে।
প্রাথমিকভাবে ভিকটিমের কোনো পরিচয় না পাওয়ায় পিবিআই ও সিআইডিসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার সহায়তায় আঙুলের ছাপ পরীক্ষা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি প্রচার করে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চালানো হয়। অন্যদিকে ক্লু না পাওয়ায় ১০ জুলাই থানা পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করে।
কিন্তু মামলার তদন্তভার গ্রহণের পর তদন্তকারী দল মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় নিহতের পরিচয় আরফানা হোসেন নির্জনা (১৬) হিসেবে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। সে সোনাডাঙ্গা থানাধীন বসুপাড়া এলাকার বাসিন্দা এবং মো. আলিম হোসেন আকাশ ও আরিফা ইয়াসমিন সিমা দম্পতির কন্যা।
পরিচয় মেলার পরপরই খুলনা সদর থানা পুলিশের একটি আভিযানিক টিম নিহতের বাসায় যায়। সেখানে নির্জনার মা আরিফা ইয়াসমিন সিমা পুলিশকে দেখে চরম সংজ্ঞাহীন আচরণ ও নানা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান করে পার পাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু পুলিশের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের নিবিড় ও মনস্তাত্ত্বিক জিজ্ঞাসাবাদের মুখে একপর্যায়ে সিমা ভেঙে পড়েন এবং নিজের কন্যাকে নিজ হাতে হত্যা করার কথা স্বীকার করেন।
তিনি জানান, তার মেয়ে নির্জনা একাধিক ছেলের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিল। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পরিবারে তীব্র অশান্তি ও চরম পারিবারিক কলহ চলছিল। ঘটনার দিন উক্ত কলহের চরম পর্যায় পৌঁছালে তারা নিজ কন্যাকে হত্যা করেন। এরপর গভীর রাতে চাতুরতার সাথে মরদেহ প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে প্রান্তিকা আবাসিক এলাকায় ফেলে আসেন।
হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদঘাটন করে খুলনা সদর থানা পুলিশ ১০ জুলাই ঘাতক মা আরিফা ইয়াসমিন সিমা (৩৫)-কে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে বিজ্ঞ আদালতে হাজির করা হলে তিনি স্বেচ্ছায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় বিচারকের কাছে নিজের দোষ স্বীকার করে লোমহর্ষক জবানবন্দি প্রদান করেন। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ও পলাতক অপর আসামি (নিহতের পিতা) মো. আলিম হোসেন আকাশকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে পুলিশের চিরুনি অভিযান ও তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
কেএমপি কমিশনার জনাব মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান জানান, এই চাঞ্চল্যকর ক্লু-লেস মার্ডারের রহস্য উদঘাটনে ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) জনাব মো. রেজাউর রহমানের নেতৃত্বে একটি চৌকস আভিযানিক টিম দিনরাত কাজ করেছে, যার ফলশ্রুতিতে ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে মূল ঘাতককে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।
উক্ত প্রেস ব্রিফিংয়ে আরও উপস্থিত ছিলেন—অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক অ্যান্ড প্রটোকল, অতিঃ দায়িত্বে এ্যাডমিন এন্ড ফিন্যান্স) জনাব মুহাম্মদ শাহনেওয়াজ খালেদ, পিপিএম-সেবা; অতিরিক্ত ডিআইজি পদে পদোন্নতি প্রাপ্ত ও অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ক্রাইম এন্ড অপস্ (ভারপ্রাপ্ত) জনাব এম, এম শাকিলুজ্জামান; অতিঃ ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) জনাব অমিত কুমার বর্মন; সহকারী পুলিশ কমিশনার (খুলনা জোন) জনাব মো. শফিকুল ইসলাম এবং খুলনা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি)। এছাড়াও খুলনায় কর্মরত প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বিপুল সংখ্যক সাংবাদিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। ছবি সংগৃহীত।

