মঠবাড়িয়া (পিরোজপুর) প্রতিনিধি:
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের একদম নতুন ও পুরোনো পাঠ্যবই এবং খাতাসহ বড় একটি ট্রাক জব্দ করা হয়। মঠবাড়িয়া সরকারি হাতেম আলী বালিকা বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে গোপনে এই নতুন বইগুলো এক ফেরিওয়ালার কাছে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দিয়েছিলেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
গতকাল শুক্রবার (২৬ জুন) দুপুর ১টার দিকে পৌর শহরের উত্তর মিঠাখালী এলাকার আরাফাত মঞ্জিলের সামনে বইভর্তি ট্রাকটিতে মালামাল তোলার সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় এটি জব্দ করা হয়।
অভিযান ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, উত্তর মিঠাখালী এলাকার মেসার্স হান্নান এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ভাঙাড়ি প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে বগুড়া ট্রান্সপোর্টের একটি ট্রাকে সরকারি বইগুলো পাচারের উদ্দেশ্যে ওঠানো হচ্ছিল। এ সময় বস্তাভর্তি নতুন বই দেখে স্থানীয় লোকজনের মনে সন্দেহ জাগে এবং তারা তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে জানান। সংবাদ পেয়ে মঠবাড়িয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সুদীপ্ত দেবনাথ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযান পরিচালনা করেন এবং সরকারি বই ও খাতাসহ ট্রাকটি হাতেনাতে জব্দ করেন।
ঘটনাস্থলে মেসার্স হান্নান এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ উল্লাহ জানান, জাকারিয়া হাওলাদার নামে এক ফেরিওয়ালা তাঁদের তুষখালী রোডের ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের কাছে এই বই ও খাতাগুলো পাইকারি দরে বিক্রি করেন। তিনি দাবি করেন, বিভিন্ন ফেরিওয়ালাদের কাছ থেকে কেজি দরে প্রায় দেড় বছর ধরে তাঁরা এসব পুরোনো কাগজ ও বই কিনে ট্রাকে তুলছিলেন।
তবে মূল রহস্য ফাঁস করে অভিযুক্ত ফেরিওয়ালা জাকারিয়া জানান, তিনি প্রায় এক সপ্তাহ আগে মঠবাড়িয়া সরকারি হাতেম আলী বালিকা বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আকতার হোসেনের কাছ থেকে ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের একদম নতুন বইসহ সর্বমোট ৫৮৭ কেজি সরকারি বই ও খাতা মাত্র কয়েক হাজার টাকায় কিনেছিলেন। এই ফেরিওয়ালা জাকারিয়া গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার উত্তর হিরণ গ্রামের বাসিন্দা।
এই গুরুতর জালিয়াতির বিষয়ে জানতে সরকারি হাতেম আলী মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আকতার হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। তবে প্রশাসনের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি স্বীকার করেছেন যে, অন্য দুজন শিক্ষককে সঙ্গে নিয়ে কিছু ‘পুরোনো বই’ মাত্র ৩২শ টাকায় ওই ফেরিওয়ালার কাছে বিক্রি করেছিলেন। কিন্তু শিক্ষাবর্ষের মাঝপথে আগামী বছরের নতুন বই কীভাবে ভাঙাড়ির দোকানে গেল, সে বিষয়ে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
এদিকে, সরকারি নতুন বই চুরির মতো স্পর্শকাতর ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ করেন উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো. জাহাঙ্গীর হোসেন। তিনি সাংবাদিকদের এড়িয়ে গিয়ে বলেন, “আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না। আমার অনেক কাজ আছে, এখন কোনো মন্তব্য করতে পারব না।”
অভিযান শেষে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সুদীপ্ত দেবনাথ সাংবাদিকদের জানান, নতুন বইসহ জব্দকৃত ট্রাকটি বর্তমানে থানা হেফাজতে রাখা হয়েছে। যেহেতু বিষয়টি সরাসরি মোবাইল কোর্টের আওতাভুক্ত নয়, তাই আগামী রোববার (২৮ জুন) অফিস চলাকালে উপজেলা পুরাতন বই বিক্রি কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) কাছে এ সংক্রান্ত একটি বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
এ প্রসঙ্গে মঠবাড়িয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আকলিমা আক্তার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “চাহিদা অনুযায়ী প্রতিটি বিদ্যালয়ে বই দেওয়া হয়, তাই অতিরিক্ত নতুন বই থাকার কোনো সুযোগ নেই। আর যদি নিয়ম অনুযায়ী কোনো বই উদ্বৃত্ত থেকে থাকে, তবে তা বিক্রি করতে হলে বাধ্যতামূলকভাবে উপজেলা কমিটিকে অবহিত করে সরকারি নিয়ম মেনে উন্মুক্ত নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করতে হবে। সংশ্লিষ্ট প্রধান শিক্ষক বই বিক্রির বিষয়ে প্রশাসনকে কিছুই জানাননি। সহকারী কমিশনারের (ভূমি) আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন পাওয়ার পরপরই দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” ছবি সংগৃহীত।


