ইউএনও কার্যালয়ে জমা দেওয়া ১লাখ টাকা উধাও!

ইউএনও কার্যালয়ে জমা দেওয়া ১লাখ টাকা উধাও!

জাকির হোসাইন (তুষার) মহম্মদপুর (মাগুরা) প্রতিনিধি:

মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলা পরিষদ চত্বরে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসরত এক মানসিক ভারসাম্যহীন নারীর এক লাখ টাকা রহস্যজনকভাবে উধাও হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর নড়েচড়ে বসেছে উপজেলা প্রশাসন। টাকা গায়েবের এই রহস্য উদঘাটনে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনাসহ কঠোর তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)।

ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার বাসিন্দা ও মৃত আব্দুর রশিদের মেয়ে খুরশিদা বেগম দীর্ঘদিন ধরে মহম্মদপুর উপজেলা পরিষদের প্রধান প্রবেশ গেটের ফাঁকা অংশে খোলা আকাশে অবস্থান করছেন। খুরশিদার দাবি, গেটের একটি বড় ফাঁকা অংশ দিয়ে রাতে আলো প্রবেশ করে এবং এতে তাঁর নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হয়। এই কারণে তিনি ওই ফাঁকা অংশে নিজের থাকার একটি নিরাপদ ব্যবস্থা (দরজা) নির্মাণের অনুরোধ জানাতে গত ১০ জুন এক লাখ টাকা নিয়ে সরাসরি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে যান।

প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিক তুষার আহমেদ ও আল-আমিন শেখ জানান, ওই দিন ইউএনও কার্যালয়ে উপস্থিত না থাকায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জাহাঙ্গীরের কক্ষে ওই নারী টাকার বান্ডিলটি জমা দেন। বিষয়টি সাক্ষী হিসেবে রাখতে জাহাঙ্গীর কক্ষের বাইরে থাকা দুই সাংবাদিককে ডেকে ভেতরে নেন। পরে সিদ্ধান্ত হয়, ইউএনও মহোদয় কার্যালয়ে ফিরলে তাঁর সাথে আলোচনা করে এই বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সাংবাদিকদের অভিযোগ, পরবর্তীতে ওই টাকাটির খোঁজ নিতে এবং ভারসাম্যহীন নারীর কাছে ফেরত চাইতে গেলে কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর জানান, তিনি টাকাটি প্রশাসনিক কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করেছেন। আবার জাহিদুল ইসলাম দাবি করেন, ইউএনওর নির্দেশে তিনি ও এক ইউপি সদস্য টাকাটি খুরশিদাকে ফিরিয়ে দিতে গিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে টাকার বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে কেউই আর কোনো স্পষ্ট জবাব দিতে পারেননি। এর মধ্যেই স্থানীয়ভাবে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে যে, অসহায় নারীর সেই টাকাটি ভেতরে ভেতরে ভাগাভাগি করে নেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সিরাজুল ইসলাম বলেন, “টাকাটি সর্বশেষ প্রশাসনিক কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলামের কাছেই গচ্ছিত ছিল বলে আমি নিশ্চিতভাবে জানি।” তবে অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলামের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি দায়সারাভাবে বলেন, “টাকা কোথায় আছে, আমি জানি না। সকালে ইউএনও অফিসে আসলে তখন কথা বলব।”

এদিকে এক অসহায় ভারসাম্যহীন নারীর জমানো টাকা সরকারি কার্যালয় থেকে উধাও হওয়ার খবরটি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মহম্মদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বেদবতী মিস্ত্রী সংশ্লিষ্ট সবাইকে জরুরি ভিত্তিতে তাঁর কার্যালয়ে ডেকে পাঠান এবং ঘটনার দিন ও পরবর্তী সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ নিবিড়ভাবে পর্যালোচনার নির্দেশ দেন।

ইউএনও বেদবতী মিস্ত্রী ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, “গত ১০ জুন ওই নারী আমার কার্যালয়ে এসেছিলেন। পরে জানতে পারি, তিনি আমার স্টাফদের কাছে এক লাখ টাকা জমা দিয়েছেন। জানার পরপরই আমি প্রশাসনিক কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম ও উপস্থিত জনপ্রতিনিধি সিরাজুল ইসলামকে টাকাটি দ্রুত ওই নারীর কাছে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিই। তবে এখন শুনছি টাকা তাঁর কাছে পৌঁছায়নি। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে যদি আমার কার্যালয়ের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী এই টাকা আত্মসাতের সাথে জড়িত প্রমাণিত হন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাসহ সর্বোচ্চ কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

প্রশাসনের নাকের ডগায় ঘটে যাওয়া এমন স্পর্শকাতর ঘটনায় স্থানীয় সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তারা অনতিবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অসহায় খুরশিদার টাকার প্রকৃত অবস্থান উদঘাটন এবং এই চুরির সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন। ছবি সংগৃহীত।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *