স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চ বেতনে চাকরি ও স্থায়ীভাবে বসবাসের (পিআর) ভুয়া প্রলোভন দেখিয়ে ওমান প্রবাসী এক বাংলাদেশির কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় দুই অন্তর্জাতিক সাইবার প্রতারককে গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের (সিপিসি) একটি চৌকস আভিযানিক দল গত ১৭ জুন ২০২৬ তারিখে নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর থানাধীন কামারপুকুর বাজার এলাকায় এক ঝটিকা অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতরা হলো—নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার আইসঢাল হাজীপাড়া গ্রামের মো. রাকিবুল হোসেন (২৬) এবং রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার মৌলভীপাড়া গ্রামের মো. রনি ইসলাম ওরফে খাজা মোহাম্মদ আলী (১৯)। গ্রেফতারের সময় তাদের হেফাজত থেকে অপরাধকর্মে ব্যবহৃত ৬টি আধুনিক মোবাইল ফোন এবং ১২টি সচল সিম কার্ড জব্দ করা হয়েছে।
মামলার এজাহার ও সিআইডির সাইবার বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এই চক্রের মূল টার্গেট ছিলেন ওমান প্রবাসী এক সরলমনা বাংলাদেশি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ভুক্তভোগীর এক পূর্বপরিচিত ব্যক্তি তাঁর সাথে যোগাযোগ করে জানান যে, বাংলাদেশ থেকে লোক নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় ভালো বেতনে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছেন তাঁর এক অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বন্ধু ‘খাজা মোহাম্মদ আলী’। পরবর্তীতে কথিত সেই প্রবাসী বন্ধু রনি ইসলাম ওরফে খাজা মোহাম্মদ আলী ওমান প্রবাসীর সাথে ইমু, হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জারে যোগাযোগ শুরু করে। অস্ট্রেলিয়ায় নেওয়ার শতভাগ গ্যারান্টি দিয়ে অনলাইন আবেদন, ফাইল প্রসেসিং, মেডিকেল ও ভিসা সংক্রান্ত খরচের কথা বলে ধাপে ধাপে বিভিন্ন বিকাশ নম্বরে মোট ১ লক্ষ ৪৬ হাজার ৪০০ টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি। পরবর্তীতে আরও মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার জন্য তারা একটি ব্যাংক হিসাব নম্বরও সরবরাহ করে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পরও ভিসা না দিয়ে উল্টো যোগাযোগকারী সব মোবাইল নম্বর বন্ধ করে দিয়ে চক্রটি আত্মগোপনে চলে যায়। প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে ভুক্তভোগীর ভাগ্নে বাদী হয়ে গত ২ জুন ২০২৬ তারিখে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী (ডিএমপি) থানায় দণ্ডবিধির ৪০৬/৪২০ ধারায় একটি মামলা (মামলা নং-০৪) দায়ের করেন।
মামলাটির ডকেট পাওয়ার পর তদন্তে নামে সিআইডির সাইবার ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড অপারেশনস টিম। তথ্যপ্রযুক্তি ও উন্নত গোয়েন্দা বিশ্লেষণের মাধ্যমে সিআইডি জানতে পারে, গ্রেফতারকৃত তরুণ রনি ইসলাম মূলত ‘খাজা মোহাম্মদ আলী’ নাম ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় ভুয়া ফেসবুক পেজ পরিচালনা করত। ওই পেজে অস্ট্রেলিয়ার ওয়ার্ক পারমিট, ভিসা প্রাপ্তি এবং উন্নত জীবনের প্রলোভন সংবলিত বিভিন্ন এডিটেড ভিডিও আপলোড করে সাধারণ মানুষকে প্রলুব্ধ করা হতো। বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য তারা অনলাইনে ক্লন করা অস্ট্রেলিয়ান নম্বরভিত্তিক ইমু অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করত। অন্যদিকে, গ্রেফতারকৃত রাকিবুল হোসেন ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে নেওয়া অবৈধ টাকা বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিং ও বিকাশ অ্যাকাউন্টে গ্রহণ, দ্রুত স্থানান্তর এবং লেনদেনের পুরো ম্যানেজমেন্ট সক্রিয়ভাবে দেখভাল করত। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা ডিজিটাল প্রতারণার মাধ্যমে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য স্বীকার করেছে। এই চক্রের সাথে জড়িত অন্য সদস্যদের সন্ধান ও গ্রেফতারে সিআইডির সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং ধৃত আসামিদের বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করার আইনি প্রক্রিয়া চলমান। একই সাথে, ফেসবুক বা অনলাইনে কোনো এজেন্সির লোভনীয় বিজ্ঞাপন দেখে টাকা লেনদেন না করতে এবং যেকোনো সংস্থায় অর্থ দেওয়ার পূর্বে সরকারিভাবে লাইসেন্স যাচাই করার জন্য সিআইডির পক্ষ থেকে দেশ-বিদেশের সকল নাগরিকদের বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে। ছবি সংগৃহীত।


