স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
চিকিৎসকের দেওয়া প্রেসক্রিপশন বা ব্যবস্থাপত্র যেন কোনো সাধারণ কাগজ নয়, বরং এক অলিখিত ‘লুকানো কোড’! প্রেসক্রিপশনে কী ওষুধের নাম লেখা হয়েছে, তা মাগুরা শহরের নামী-দামী কোনো ওষুধের দোকানের অভিজ্ঞ বিক্রেতারাও পড়ে উদ্ধার করতে পারছেন না। ফলে শহর জুড়ে ঘুরেও মিলছে না ওষুধ। চিকিৎসকের এমন দুর্বোধ্য হাতের লেখার আড়ালে মূলত নির্দিষ্ট কিছু ফার্মেসির সাথে ‘কমিশন বাণিজ্য’ ও রোগীদের পকেট কাটার সুপরিকল্পিত ফাঁদ পাতা হয়েছে বলে তীব্র অভিযোগ উঠেছে। মাগুরা শহরের গ্রামীণ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের গাইনি বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. দিলারা আকবার লাবনীর (লাবনী) বিরুদ্ধে এমন অভিনব ও অমানবিক হয়রানির অভিযোগ এনেছেন একাধিক ভুক্তভোগী রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা।
সরবরাহকৃত প্রেসক্রিপশনের ছবি থেকে দেখা যায়, গ্রামীণ ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মাগুরা-এর প্যাডে গত ১৩ মে ২০২৬ তারিখে এক ১৮ বছর বয়সী নারী রোগীকে ব্যবস্থাপত্র দিয়েছেন ডা. দিলারা আকবার লাবনী (এমবিবিএস, ডিজিও, সিএমইউ-আল্ট্রা)। তবে সেই প্রেসক্রিপশনে ওষুধের নাম ও সেবনের নিয়ম যেভাবে পেঁচিয়ে লেখা হয়েছে, তা সাধারণ কোনো ফার্মেসি বা ওষুধ বিক্রেতার পক্ষে পড়া সম্পূর্ণ অসম্ভব।
ভুক্তভোগী রোগীরা জানান, এই চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নিতে গিয়ে সুস্থ হওয়ার বদলে উল্টো চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। প্রেসক্রিপশন নিয়ে মাগুরা শহরের একের পর এক ফার্মেসিতে ঘুরেও কোনো ওষুধ পাওয়া যায়নি, কারণ কোনো দোকানদারই লেখার বর্ণগুলো উদ্ধার করতে পারেননি। অভিযোগ রয়েছে, রোগীরা যখন ওষুধ না পেয়ে নিরুপায় হয়ে পুনরায় ওই ডাক্তারের শরণাপন্ন হন, তখন তিনি সুকৌশলে শহরের নির্দিষ্ট কয়েকটি ওষুধের দোকানের নাম বলে সেখানে যাওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, “ঐসব নির্দিষ্ট দোকানে যান, তাহলে আমার ওষুধগুলো তারা বুঝতে পারবে।”
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডাক্তারের নির্দিষ্ট করে দেওয়া ওইসব দোকানে যাওয়ামাত্রই জাদুকরী উপায়ে প্রেসক্রিপশনের লেখা উদ্ধার হয়ে যায় এবং ওষুধও মেলে। তবে বিপত্তি বাঁধে দামের ক্ষেত্রে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সাধারণ বাজারে যে ওষুধের যা দাম, ডাক্তারের ইশারা চলিত ওই নির্দিষ্ট দোকানগুলোতে একই ওষুধের দাম রাখা হয় প্রায় দ্বিগুণ! সাধারণ ফার্মেসিতে যেন ওষুধের নাম বুঝতে না পারা যায়, সেজন্যই ডাক্তার ইচ্ছাকৃতভাবে এমন দুর্বোধ্য ও অপাঠ্য ভাষায় প্রেসক্রিপশন লেখেন, যাতে রোগীরা ঘুরেফিরে তাঁর নির্ধারিত সিন্ডিকেটের দোকানেই যেতে বাধ্য হন। এতে রোগীরা চরম শারীরিক হয়রানির পাশাপাশি মারাত্মকভাবে অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
এখানেই শেষ নয়, ওই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে রোগীদের সাথে অত্যন্ত খিটখিটে ও দুর্ব্যবহার করারও বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। কোনো সচেতন রোগী বা স্বজন যদি প্রেসক্রিপশনের লেখা বা ওষুধের দাম নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলেন, তবে তাঁর সাথে চরম খারাপ আচরণ করা হয় বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন। এছাড়া নিজের পছন্দের ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে চড়া মূল্যে বিভিন্ন টেস্ট (পরীক্ষা-নিরীক্ষা) করাতে রোগীদের বাধ্য করে মোটা অঙ্কের কমিশন বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগের আঙুল উঠেছে তাঁর দিকে।
এসব গুরুতর অভিযোগ, নির্দিষ্ট দোকানের সিন্ডিকেট এবং প্রেসক্রিপশনের পাঠোদ্ধার না হওয়ার বিষয়ে বক্তব্য জানতে উক্ত চিকিৎসকের ব্যবহৃত মোবাইল নাম্বারে (01624-671450) একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও অপরপ্রান্ত থেকে কেউ কল রিসিভ করেননি। ফলে তাঁর কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী চিকিৎসকদের স্পষ্ট অক্ষরে কিংবা কম্পিউটারে টাইপ করে প্রেসক্রিপশন লেখার নিয়ম থাকলেও, মাগুরার এই চিকিৎসকের এমন প্রকাশ্য ‘কমিশন সিন্ডিকেট’ ও রোগীদের পকেট কাটার মহোৎসব বন্ধে স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রশাসন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। ছবি সংগৃহীত।

