মাগুরা প্রতিনিধি:
মাগুরা সদর উপজেলার বেরইল পলিতা ইউনিয়নের রামদেরগাতী এলাকায় এক মর্মান্তিক, হৃদয়বিদারক ও পৈশাচিক ঘটনা ঘটে গেছে। নিজের সুখ আর টাকার লোভে মাত্র ১ মাস ২৫ দিন (৫৫ দিন) বয়সী নিজের ফুটফুটে কন্যা সন্তানকে স্ত্রীর অজান্তে মাত্র ২৫ হাজার টাকার স্ট্যাম্প চুক্তির বিনিময়ে বিক্রি করে দিয়েছেন এক পাষণ্ড পিতা। শুধু তাই নয়, সন্তানকে না পেয়ে মা যখন পাগলপ্রায়, তখন নিজের অপরাধ ঢাকতে ‘সন্তানকে জীনে ধরে নিয়ে গেছে’ বলে দীর্ঘ দুই মাস ধরে অবুঝ স্ত্রীকে মিথ্যে আশ্বাস ও রূপকথার গল্প শুনিয়ে বিভ্রান্ত করে আসছিলেন ওই পিতা। অবশেষে মাগুরা জেলা পুলিশের এক মানবিক ও ঝটিকা অভিযানে বিক্রীত সেই শিশুটিকে উদ্ধার করে তাঁর প্রকৃত মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার (১৮ জুন ২০২৬) দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে মাগুরার মঘী ইউনিয়নের দক্ষিণ বীরপুর এলাকা থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, মাগুরা সদর উপজেলার রামদেরগাতী গ্রামের বাসিন্দা মোঃ সাগর হোসেন (৩৪) তাঁর স্ত্রী তানজিলা খাতুনের অজান্তে ও সম্পূর্ণ গোপনে নিজেদের একমাত্র কন্যাসন্তান শিশু টুকটুকিকে দত্তক দেওয়ার নামে গত ২৭ মে ২০২৬ তারিখে মাগুরা সদরের দক্ষিণ বীরপুর গ্রামের বাসিন্দা মোঃ শাহাবুর (২৮) ও তাঁর স্ত্রী মনিরা খাতুন (২৫) দম্পতির নিকট মাত্র ২৫,০০০/- (পঁচিশ হাজার) টাকার বিনিময়ে ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে লিখিত চুক্তির মাধ্যমে বিক্রি করে দেন।
এদিকে, প্রসবের পর বুক খালি হওয়া মা তানজিলা খাতুন যখনই নিজের কলিজার টুকরো সন্তানের খোঁজ করতে যেতেন, তখনই অভিযুক্ত পিতা সাগর হোসেন অত্যন্ত চতুরতার সাথে নাটক সাজিয়ে স্ত্রীকে বলতেন—‘আমাদের সন্তানকে জীনে নিয়ে গেছে, আমি জীনের সাথে যোগাযোগ করছি, জীনদের মাধ্যমে খুব শীঘ্রই সন্তানকে সুস্থ অবস্থায় ফেরত আনা হবে।’ এভাবে জীনের ভয় দেখিয়ে ও অলৌকিক গল্প শুনিয়ে পাষণ্ড স্বামী প্রায় দুই মাস অতিবাহিত করেন। একপর্যায়ে স্বামীর আচরণে সন্দেহ হলে এবং সন্তানের কোনো হদিস না পেয়ে ভুক্তভোগী মা বিষয়টি স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও পুলিশের এক সোর্সের মাধ্যমে মাগুরা জেলা পুলিশকে অবহিত করেন।
লোমহর্ষক ও স্পর্শকাতর এই ঘটনাটি জানার পর মাগুরা জেলা পুলিশের পুলিশ সুপার (এসপি) জনাব মোল্লা আজাদ হোসেন, পিপিএম-সেবা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেন এবং তাৎক্ষণিক শিশুটিকে জীবিত উদ্ধারের জন্য শত্রুজিৎপুর পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ এসআই (নিঃ) শুভংকর রায়কে কঠোর নির্দেশ প্রদান করেন।
পুলিশ সুপারের সরাসরি দিকনির্দেশনায় শত্রুজিৎপুর ক্যাম্প পুলিশ মাঠে নেমে প্রকাশ্য ও গোপন তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে। পরবর্তীতে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি এবং স্থানীয় বিশ্বস্ত সোর্সের নিখুঁত সহায়তায় আজ ১৮ জুন দুপুর ২টার দিকে মঘী ইউনিয়নের দক্ষিণ বীরপুর এলাকায় ক্রেতা মোঃ শাহাবুর ও মনিরা খাতুন দম্পতির বাড়িতে আকস্মিক হানা দেয় পুলিশ। সেখান থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় শিশু টুকটুকিকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। পরবর্তীতে আজ বিকেলেই মাগুরা সদর থানায় আইনি ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে উদ্ধারকৃত শিশুটিকে কান্নারত ও আবেগাপ্লুত মা তানজিলা খাতুনের কোলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। নিজের হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে বুকে ফিরে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা এবং পুলিশের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
মাগুরা জেলা পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, টাকার বিনিময়ে সন্তান কেনাবেচার মতো এই জঘন্য ও মানবাধিকার বিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অপরাধে পাষণ্ড পিতা সাগর হোসেন এবং শিশুটির অবৈধ ক্রেতা শাহাবুর ও মনিরা খাতুন দম্পতির বিরুদ্ধে মানবপাচার ও শিশু নির্যাতন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় একটি নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়েরের আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত গতিতে চলমান রয়েছে। মাগুরা জেলা পুলিশ সর্বদা জনগণের জানমালের নিরাপত্তা, মানবাধিকার রক্ষা এবং যেকোনো ধরনের অপরাধ দমনে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করে আসছে এবং এই অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। ছবি সংগৃহীত।


