ধর্ষণের পর জোরপূর্বক নাচ-গান, অতঃপর লাশ ৩ টুকরো করে খাদে নিক্ষেপ

ধর্ষণের পর জোরপূর্বক নাচ-গান, অতঃপর লাশ ৩ টুকরো করে খাদে নিক্ষেপ

স্ফুলিঙ্গ  রিপোর্ট :

বিগত ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের উত্তাল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে চট্টগ্রামের ভূজপুরে রিনা আক্তার (২৫) নামে এক তরুণীকে জোরপূর্বক আটকে রেখে পৈশাচিক গণধর্ষণ, জোরপূর্বক নাচ-গান করানো এবং নির্মমভাবে হত্যার পর লাশ তিন টুকরো করে গুম করার লোমহর্ষক ও নৃশংস ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। দীর্ঘ ৯ মাস পর ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে খণ্ডিত মরদেহের সুনির্দিষ্ট পরিচয় শনাক্তের পর দেশজুড়ে সাড়া জাগানো এই মামলায় জড়িত আরও দুই এজাহারনামীয় আসামিকে গ্রেফতার করেছে পিবিআই।

গ্রেফতারকৃতরা হলেন—মামলার ৩৫ নম্বর আসামি মোঃ আলাউদ্দিন এবং ৩৪ নম্বর আসামি মোঃ রামজান আলী। গত ২০ ও ২১ জুনের (২০২৬) পৃথক অভিযানে ফেনী সদর ও চট্টগ্রামের হাটহাজারী থেকে তাঁদের গ্রেফতারের পর বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।

পিবিআই চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয় ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, গত ২৬ জুলাই ২০২৪ তারিখ বিকেল আনুমানিক ২টার দিকে জুলাই আন্দোলনের ডামাডোলের মধ্যে ভিকটিম রিনা আক্তার ভূজপুর থানার পাশে অবস্থিত মান্নানের টিলার পথ দিয়ে তাঁর পিতার বাড়িতে যাচ্ছিলেন। এ সময় মোঃ নাজেম (প্রকাশি নাদের) নামের এক বখাটে রিনাকে একা পেয়ে জোরপূর্বক পথরোধ করে এবং ১ নম্বর আসামি আব্দুল মান্নানের টিলায় অবস্থিত একটি নির্জন টিনের ঘরে নিয়ে আটকে রাখে। পরে নাদের মোবাইল ফোনে অন্য সহ-আসামিদের ডেকে ঘটনাস্থলে নিয়ে আসে।

সেখানে অবরুদ্ধ রিনাকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে জোরপূর্বক নাচ-গান করতে বাধ্য করা হয়। পৈশাচিক আনন্দের একপর্যায়ে মূল হোতা আব্দুল মান্নানসহ তার নরপশু সহযোগীরা রিনাকে উপর্যুপরি গণধর্ষণ করে। এই নির্মম নির্যাতনের পর রিনা আক্তার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং এই পৈশাচিক ও জোরপূর্বক নাচ-গান এবং গণধর্ষণের বিষয়টি স্থানীয় এলাকাবাসীর কাছে ফাঁস করে দেওয়ার হুমকি দেন। এতে আসামিরা ক্ষিপ্ত ও আতঙ্কিত হয়ে রিনাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এরপর অপরাধ ধামাচাপা দিতে মান্নান তার সহযোগীদের সহায়তায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে রিনার মরদেহ কেটে তিন টুকরো করে এবং টিলার পাশের একটি গভীর খাদে ফেলে রেখে সবাই এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়।

ঘটনার পর থেকে রিনা নিখোঁজ ছিলেন। পরবর্তীতে গত ৪ আগস্ট ২০২৪ তারিখে স্থানীয় একটি মসজিদের ইমামের মাধ্যমে ওই টিলা থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ানোর খবর পেয়ে ভিকটিমের মা ঘটনাস্থলে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরদিন ৫ আগস্ট দুপুরে মান্নানের টিলার বাগান সংলগ্ন গভীর খাদ থেকে রিনার গলিত ও খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এই নৃশংস ঘটনায় ভিকটিমের মা বাদী হয়ে বিজ্ঞ আদালতে আব্দুল মান্নানসহ তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে নালিশি অভিযোগ দায়ের করলে আদালতের নির্দেশে ভূজপুর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০২৫)-এর আওতায় একটি নিয়মিত গণধর্ষণ ও হত্যা মামলা রুজু হয়।

পরবর্তীতে আদালতের আদেশে গত ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে পিবিআই চট্টগ্রাম জেলা এই স্পর্শকাতর মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে। লাশের অবস্থা অত্যন্ত গলিত থাকায় পরিচয় নিশ্চিত করতে পিবিআই ল্যাবরেটরিতে ডিএনএ পরীক্ষা সম্পন্ন করে পরিচয় নিশ্চিত করে।

বর্তমান তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই চট্টগ্রামের দক্ষ পুলিশ পরিদর্শক মোঃ সালাহ উদ্দিন আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত ২০ জুন ২০২৬ তারিখ দিবাগত রাত ১২টার দিকে ফেনী সদর থানা এলাকায় ঝটিকা অভিযান চালিয়ে ৩৫ নম্বর আসামি মোঃ আলাউদ্দিনকে গ্রেফতার করেন। পরবর্তীতে তার দেওয়া স্বীকারোক্তি ও তথ্যের ভিত্তিতে পরদিন ২১ জুন দুপুরে চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৩৪ নম্বর আসামি মোঃ রামজান আলীকেও গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পিবিআই।

পিবিআইয়ের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত আলাউদ্দিন ও রামজান আলী রিনা আক্তারকে জিম্মি করে গণধর্ষণ এবং পরবর্তীতে গলা কেটে লাশ তিন টুকরো করে খাদের নিচে ফেলে দেওয়ার সাথে সরাসরি জড়িত থাকার কথা অকপটে স্বীকার করেছে। গত ২২ জুন তাদের কঠোর পাহারায় বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হলে আদালত তাদের জেলহাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন। পিবিআই জানিয়েছে, এই মামলার মূল পরিকল্পনাকারী আব্দুল মান্নানসহ ঘটনার সাথে জড়িত অন্যান্য পলাতক নরপশুদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে বিশেষ চিরুনি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ছবি সংগৃহীত।

আরো পড়ুন

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *