৩ বছরেও মেলেনি চালুর অনুমতি

৩ বছরেও মেলেনি চালুর অনুমতি

জাহিদ হাসান সোহান, (যশোর) চৌগাছাঃ

যশোরের চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাস্থ্যসেবা এখন খাদের কিনারে। চার লাখ বাসিন্দার এই জনপদে ৩২ জন চিকিৎসকের বিপরীতে বাস্তবে সেবা দিচ্ছেন মাত্র ২৪ জন। হাসপাতালটি ২০২৩ সালে প্রায় ৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০০ শয্যায় উন্নীত কল্পে ৬ তলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণ হলেও এখনো মেলেনি চালুর অনুমোদন। জনবল বলতে গেলে ২০ শয্যা বিশিষ্ট। একদিকে হাসপাতালটির টানা ১০ বার দেশসেরা হওয়ার গৌরবময় অতীত, অপরদিকে প্রশাসনিক অবহেলায় মুখ থুবড়ে পড়া বর্তমান। অনুমোদন বিলম্বে অব্যবহৃত নতুন ভবন থেকে চুরি হয়েছে অক্সিজেন পাইপ ও মালামাল।

বর্তমানে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল হলেও এখানে ১০০ থেকে ১৫০ জন রোগী সব সময় ভর্তি থাকে। কখনো কখনো রোগীর সংখ্যা এতটাই বৃদ্ধি পায় যে বেড সংকুলানে বারান্দায় থাকতে বাধ্য হয় রোগীরা। প্রতিদিন আউটডোরে সেবা প্রার্থী থাকে ১ হাজার থেকে সাড়ে ১২’শ রোগী।

প্রায় ৪ লাখ মানুষ এই উপজেলায় বসবাস করে। এছাড়াও চৌগাছার পার্শ্ববর্তী উপজেলা মহেশপুর, ঝিকরগাছা, কোটচাঁদপুর,কালীগঞ্জ, শার্শা ও যশোর সদর থেকে এখানে চিকিৎসা সেবা নিতে আসেন প্রচুর মানুষ। ভবন ও কর্মচারী সংকট এত বিপুল সংখ্যক জনগণের চিকিৎসা সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। অনুমোদন ব্যতীতই ভবনের মালামাল চুরি ঠেকাতে ও সেবা প্রার্থীদের ভিড় সামলাতে স্বল্প পরিসরে ব্যবহার করতে হচ্ছে নতুন ভবন। চিকিৎসকদের কোন রেস্ট বা বিশ্রাম নেয়ার অবকাশ নাই বললেই চলে।

এই হাসপাতালে ইএনটি, চর্ম ও যৌন, অর্থোসার্জারী, সহকারী সার্জন, প্যাথলজিস্ট সহ গুরুত্বপূর্ণ বেশিরভাগ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। ৩২ জন চিকিৎসকের পদ থাকলেও শূণ্য আছে ৮ টি পদ। এছাড়া স্বাস্থ্য সহকারীর বেশির ভাগ পদ দীর্ঘদিন শূন্য সহ আল্ট্রাসনোলজিস্ট না থাকাই কাঙ্খিত সেবা পাচ্ছে না রোগীরা। অত্র কমপ্লেক্সের যেখানে মোট কর্মকর্তা কর্মচারীর পদ সংখ্যা ২২১ জন, সেখানে রয়েছে ১৩৪ জন। দীর্ঘদিন শূণ্য পদ রয়েছে ৮৭ টি। এছাড়াও, শুধুমাত্র অপারেশন থিয়েটারে রয়েছে জেনারেটর ব্যবস্থা।

স্থানীয়রা জানান, ১০ টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা মিলিয়ে উপজেলায় অন্তত চার লাক্ষাধিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবার একমাত্র সরকারি হাসপাতাল এটি। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ৫০ শয্যার হাসপাতালটি ১০০ শয্যায় উন্নীত কল্পে ভবন নির্মাণ হলেও মেলেনি ১০০ শয্যা চালুর অনুমোদন। এমনকি দেওয়া হয়নি চাহিদা মতো জনবল।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হাসপতালের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার পদ একজন, যাহা রয়েছে। জুনিয়ার কনসালটেন্টের পদ  ১০টি, রয়েছে ৮ টি। এর মধ্যে নিয়ম অনুযায়ী তারা সপ্তাহে রোগী দেখছেন ২ দিন। আবাসিক মেডিকেল অফিসারের পদ ১ টি, যাহা শূন্য। মিডওয়াইফ এর পদ ৮ টি, রয়েছে ১ টি। মেডিকেল টেকনোলজিস্টের (ফার্মাসিস্ট) পদ ৪ টি, যা রয়েছে সম্পূর্ণ ফাঁকা।

এছাড়া ১ম শ্রেণির ৪৩ টি পদের মধ্যে ২৭টি পদই ফাঁকা। ২য় শ্রেণির ৩৯ টি পদের মধ্যে ৩১ টি পদই ফাঁকা। ৩য় শ্রেণির ১১৩ টি পদের মধ্যে ৬২ টি পদই ফাঁকা। এবং ৪র্থ শ্রেণির ২৬ টি পদের মধ্যে ১৪ টি পদই ফাঁকা। চিকিৎসা সেবা নিতে আসা জনগণকে অনেক সময় চিকিৎসা সেবা না পেয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। আবার সংকটের কারণে চিকিৎস্যা দিতে না পারায় উন্নত চিকিৎসার কথা বলে যশোর জেনারেল হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়। প্যাথলজি বিভাগেও পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় পরিক্ষা নিরীক্ষার জন্য রুগীদের যেতে হয় বাহিরের ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। প্রয়োজনীয় শয্যা ও জনবল সংকটে চরমভাবে চিকিৎসা সেবা ব্যাহত সহ নানা সমস্যায় জর্জরিত এই হাসপাতালটি।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা উপজেলার সিংহঝুলী গ্রামের মোজাম্মেল হক বলেন, শ্বাসকষ্ট ও কাশি জনিত সমস্যার কারণে ডাক্তার দেখতে এসেছিলাম। ডাক্তার রক্ত পরীক্ষা করতে বলেছে। পরিক্ষার জন্য রক্ত দিয়ে ২ ঘন্টা যাবৎ লাইনে দাঁড়িয়ে আছি এখনো রিপোর্ট হাতে পাইনি। টাকা দিয়ে বাইরে থেকে রক্ত পরিক্ষা করানোর মত অবস্থা নেই।

হাসপাতালের ইমারজেন্সি মেডিকেল অফিসার ডাঃ সুরাইয়া পারভীন বলেন, আজ গাইনি ও প্রসূতি রোগীদের সেবা দিচ্ছি। আবার একই সাথে আল্ট্রাসনোগ্রাম রুমে গিয়ে রোগীদের আল্ট্রাসনোগ্রাম করতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি যেন নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মু. আহসানুল মিজান রুমী জানান, হাসপাতালটি ৫০ শয্যার হলেও ব্যাপক জনবল সংকট রয়েছে। হাসপাতালের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পর্যাপ্ত জনবল নেই। অপ্রতুল সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছি। জরুরি ভিত্তিতে শূণ্য পদের জনবল পূরণ না করলে চিকিৎসা সেবা দেওয়া আমাদের পক্ষে অত্যান্ত কঠিন। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে অনেক পদই শূন্য রয়েছে। যে কারণে আমরা প্রয়োজনীয় সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছি। ইতোমধ্যে ১০০ শয্যা উন্নীততে ভবন নির্মাণ হলেও কয়েকবার অনুমোদন চেয়ে আবেদন করলেও উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ এখনো অনুমোদন করেননি। নতুন ভবনের যেহেতু প্রশাসনিক অনুমোদন নেই তাই সেখানে আসবাবপত্র, জনবল ও বাজেট নেই। আশাকরি, কর্তৃপক্ষ জনবল সংকট ও ১০০ শয্যা উন্নীততে অনুমোদনের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিবেন। এতেকরে জনগণ তাদের যথাযথ চিকিৎসার সুবিধা পাবেন। ছবি প্রতিবেদক।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *