নিজস্ব প্রতিবেদক :
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার যশোর জেলা বর্তমানে মাদকের ভয়াবহ সংক্রমণের কবলে পড়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সীমান্তবর্তী এই জেলাটি মাদক পাচারের ‘ট্রানজিট পয়েন্ট’ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় এর সহজলভ্যতা স্থানীয় যুবসমাজকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে।
জানাগেছে, যশোরের বেনাপোল, শার্শা এবং চৌগাছা সীমান্ত দিয়ে আসা মাদকের নেশায় বুঁদ হয়ে আছে জেলার হাজারো তরুন। যশোরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এক সময়ের সুস্থ-সবল কিশোর ও তরুণরা আজ চোখের কোণে কালি আর শীর্ণ শরীর নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে প্রায় এলাকার স্কুল-কলেজের ভিতরে, নির্মানাধীন বা পরিতক্ত ভবনে,নদী,খাল বা বিলের পাড়ে বা পার্কের ভিতরে উঠতি বয়সের কিশোর সহ নানা বয়সের মাদকসেবীদের তৎপরতা চোখে পড়ার মতন ।
একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রায় এলাকার স্থানীয় কিছু চিহ্নিত প্রভাবশালী কতিপয় ব্যক্তির সহযোগিতায় প্রতিটি এলাকায় মাদকের ব্যবসা পরিচালনা হচ্ছে। ওই সব চিহ্নিত প্রভাবশালীরা কিশোর ও যুবকদের মাদক সেবনে উৎসাহিত করে তাদের স্বার্থ হাসিল করে নিচ্ছে। ওদের দিয়ে তারা চাঁদাবাজি সহ বিভিন্ন অপকর্মে লিপ্ত করাচ্ছে। ভয়ে এসব দেখেও সাধারন মানুষ না দেখার ভান করে থাকে। আর কেউ প্রতিবাদ করলে তারপর নেমে আসে নির্যাতনের খড়গ।
বর্তমানে মাদক বিক্রেতারা মাদক বিক্রয়ের ক্ষেত্রে নয়া নয়া কৌশল অবলম্বন করছে। তারা এখন মেসেঞ্জার হোয়াটসঅ্যাপ সহ বিভিন্ন অ্যাপস মাধ্যমে চ্যাট করে এখন মাদক বিক্রয় চালিয়ে যাচ্ছে। কেউ আবার হোম সার্ভিসও দিচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ভুক্তভোগী বাবা জানান, “আমার কলেজ পড়ুয়া ছেলেটি এখন রাত-দিন ঘরে থাকে না। নেশার টাকা না দিলে ঘরে ভাঙচুর করে। ফোনের মাধ্যমে সে মাদক হাতের কাছে পেয়ে যাচ্ছে। এমনচিত্র প্রতিটি এলাকারই। খুব সহজেই অল্প দামে নেশার সামগ্রী পাওয়া যাচ্ছে ।
ভৌগোলিক কারণে ইয়াবা, ফেনসিডিল এবং নতুন উপদ্রব ‘আইস’ খুব সহজেই হাতের নাগালে পৌঁছে যাচ্ছে তরুন যুব সমাজের হাতে। তবে ফেনসিডিলের দাম বেশি হওয়ায় কিশোর, তরুণ ও যুবকেরা ইয়াবা, গাঁজা, ভারতীয় বিভিন্ন নেশার ট্যাবলেট, দেশীয় কাশির সিরাপ সেবন করছে। অনেকে আবার দেশীয় কাশি সিরাপের সাথে ঘুমের ট্যাবলেট মিশিয়ে সেবন করছে। অপরদিকে দাম বেশি হলেও বিত্তশালী মাদকসেবীরা ফেনসিডিল সেবন চালিয়ে যাচ্ছে।
জানাগেছে, যশোর শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিতি থাকলেও কর্মসংস্থানের অভাবে হতাশগ্রস্ত অনেক তরুণরা নেশার মাধ্যমে সাময়িক মুক্তি খুঁজছে। সবচেয়ে ভয়ানক পরিস্থিতি কিশোরদের হাতে সহজে পৌঁছে এসব যাচ্ছে মাদক। যার ফলে শহরের প্রতিটি এলাকায় মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে কিশোররা দলবদ্ধ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
জানা গেছে, যশোরে গত এক বছরে মাদক সংশ্লিষ্ট অপরাধের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। মাদকাসক্তদের বড় অংশই ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী। এছাড়াও মাদকের কবলে পড়ে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাদকসেবীরা ফেনসিডিল ইয়াবা ও গাঁজার পাশাপাশি অনেকে আবার ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক নিচ্ছে। যার ফলে হেপাটাইটিস ও এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে। ইদানিং যশোরে এইচআইভি সংক্রমণের হার অনেক বৃদ্ধিও পেয়েছে বিশেষ করে তরুণ তরুণীদের মধ্যে। সম্প্রতি স্থানীয় কিছু পত্রিকায় এ নিয়ে সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে।
স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন নিয়মিত অভিযান চালালেও রুটপর্যায়ে মাদক নির্মূল করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে । নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যশোরের সচেতন কয়েকজন নাগরিকের মতামত জানতে চাইলে তারা জানান ,সীমান্ত দিয়ে মাদকের প্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ না করলে এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকলে কেবল লোক দেখানো অভিযানে কোনো লাভ হবে না। তারা বলেন, আমাদের সন্তানদের বাঁচাতে হলে পাড়ায় পাড়ায় মাদকবিরোধী প্রতিরোধ কমিটি গড়তে হবে এবং কমিটির সদস্যদের কার্যকর ও কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে এবং যুবসমাজকে বাঁচাতে হলে অবিলম্বে জেলাজুড়ে মাদকবিরোধী বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রাম চালু করা প্রয়োজন। সেই সাথে বিনোদনের জন্য খেলার মাঠ এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পুনরায় চাঙ্গা করা জরুরি বলে তারা মনে করেন।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জরুরি পদক্ষেপ না নিলে এই ঐতিহ্যবাহী জেলা অচিরেই এক পঙ্গু প্রজন্মের অভিশাপ বহন করবে বলে সচেতন মহল দাবি করেন।

