স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
কারাগারের চার দেয়ালও দমাতে পারেনি তাকে। যতবারই গ্রেপ্তার হয়েছেন, জামিনে বেরিয়ে এসে ততবারই আরও দ্বিগুণ বেপরোয়া হয়ে মেতেছেন চুরির নেশায়। এমনকি খোদ পুলিশ কর্মকর্তার বাড়িতে চুরি করতেও যে পিছপা হয়নি— সেই কুখ্যাত ও দুর্ধর্ষ সিঁধেল চোর শাহিন ইসলাম শামীম ওরফে ‘স্পাইডার শামীম’ (৩২)-কে অবশেষে তার সহযোগী স্ত্রীসহ বাগে এনেছে পুলিশ।
শুক্রবার (১০ জুলাই ২০২৬) সকালে যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার দুই চৌকস ফাঁড়ির যৌথ অভিযানে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিকেলেই বিজ্ঞ আদালতের নির্দেশে এই অপরাধী দম্পতিকে সরাসরি জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
যশোর পুলিশের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, সম্প্রতি এক পুলিশ কর্মকর্তার বাসভবনে দুর্ধর্ষ চুরির ঘটনা ঘটিয়েছিল এই স্পাইডার শামীম। সেই সময় অত্যন্ত সাহসিকতা ও দক্ষতার সাথে তাকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে চোরাই মালামাল উদ্ধার করেছিলেন উপশহর পুলিশ ফাঁড়ির অত্যন্ত তৎপর কর্মকর্তা এসআই অলক কুমার দে। কিন্তু জামিন পেয়ে জেল থেকে অল্প সময়ের মধ্যে বেরিয়েই সে আবারও পুরোনো পেশায় অবতীর্ণ হয়।
পুলিশের তথ্য ও মামলার এজাহার পর্যালোচনা করে জানা যায়, গত ২৪ জুন ২০২৬ তারিখ ভোর আনুমানিক ০৫:০৮ ঘটিকার সময় যশোর শহরের কাজীপাড়া কাঁঠাল তলাস্থ ‘আমির আলী গার্ডেন’ এলাকার বাসিন্দা এম রেজাউল ইসলামের (৬৮) বাড়িতে এক চাঞ্চল্যকর চুরির ঘটনা ঘটে। সুচতুর শামীম বাথরুমের এক্সহস্ট ফ্যান খুলে অত্যন্ত কৌশলে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে। সেখান থেকে সে একটি মূল্যবান ‘ASUS’ ব্রান্ডের ল্যাপটপ, ৪ ভরি স্বর্ণালঙ্কার (যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৪ লাখ টাকা), নগদ ১ লক্ষ টাকা এবং অন্যান্য মূল্যবান মালামাল লুট করে চম্পট দেয়। ঘটনার পর সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রযুক্তির সহায়তায় চোরের অবয়ব দেখে তাকে ‘স্পাইডার শামীম’ হিসেবে শনাক্ত করে পুলিশ।
পরবর্তীতে কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি নিয়মিত মামলা রুজু করা হয় (মামলা নং-৭৭, তারিখ: ২৪/০৬/২০২৬, ধারা- ৪৫৪/৩৮০ পেনাল কোড)। মামলাটির তদন্তভার বর্তায় পুরাতন কসবা পুলিশ ফাঁড়ির সাব-ইন্সপেক্টর মো. আবু বক্কর সিদ্দিকের ওপর।
স্পাইডার শামীমকে দমনে পূর্ব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে উপশহর ফাঁড়ির এসআই অলক কুমার দে এবং পুরাতন কসবা ফাঁড়ির এসআই মো. আবু বক্কর সিদ্দিক একযোগে ছায়া তদন্ত শুরু করেন। তারা অপরাধীর গতিবিধির ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি ও টানা অনুসন্ধান চালাতে থাকেন। অবশেষে আজ শুক্রবার সকালে শেখহাটি জামরুলতলা দফাদার পুকুর কান্দা বাজার এলাকায় এক অতর্কিত হানা দিয়ে শামীমকে অবরুদ্ধ করে ফেলেন এই দুই কর্মকর্তা।
গ্রেপ্তারের পর পুলিশের ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদের মুখে শামীম কাজীপাড়ার চুরির ঘটনা স্বীকার করে। পরবর্তীতে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মোল্লাপাড়া আলতাফ চেয়ারম্যান বাড়ির উল্টো পাশে তাদের একটি ভাড়া বাসায় অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে শামীমের স্ত্রী ও চুরির মালের প্রধান জিম্মাদার আরিফা সুলতানা বৃষ্টির হেফাজত থেকে খোয়া যাওয়া সেই ল্যাপটপ এবং স্বর্ণালঙ্কার বিক্রির অবশিষ্ট ৫ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। চুরির মাল লুকিয়ে রাখা এবং অপরাধে সরাসরি সহায়তা করার অপরাধে তার স্ত্রীকেও গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, শংকরপুর মেডিকেল কলেজের সামনে (টার্মিনাল সংলগ্ন) এলাকার বাসিন্দা শহিদুল ইসলামের ছেলে শামীম মূলত একজন পেশাদার ও অত্যন্ত চতুর চোর। দেয়ালে স্পাইডারের মতো বেয়ে উঠে বাথরুমের ছোট ভেন্টিলেটর বা এক্সহস্ট ফ্যান ভেঙে ঢুকে পড়ার অদ্ভুত ক্ষমতার কারণে অপরাধ জগতে সে ‘স্পাইডার শামীম’ নামে পরিচিত।
যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মাসুম খান এই সফল অভিযানের প্রশংসা করে বলেন, “স্পাইডার শামীম অত্যন্ত দুর্ধর্ষ প্রকৃতির চোর। আমাদের ফাঁড়ির অফিসাররা বিশেষ করে এসআই অলক ও এসআই আবু বক্কর অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে লেগে থেকে এই চক্রটিকে পুনরায় ধরতে সক্ষম হয়েছেন। আসামিদের স্বীকারোক্তি ও উদ্ধারকৃত আলামতসহ তাদেরকে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হলে বিজ্ঞ বিচারক তাঁদের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন। সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তায় আমাদের এই ধরণের বিশেষ চিরুনি অভিযান অব্যাহত থাকবে।” ছবি সংগৃহীত।

