স্ফুলিঙ্গ রিপোর্ট :
যশোরের অন্যতম ব্যস্ত এবং ঐতিহ্যবাহী উপশহর এলাকার অধিকাংশ রাস্তাঘাটের এখন চরম বেহাল দশা। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় এখানকার প্রায় প্রতিটি সড়কই বর্তমানে সাধারণ মানুষের চলাচলের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই খানাখন্দে ভরা এসব রাস্তায় সৃষ্টি হচ্ছে বড় বড় কৃত্রিম গর্ত ও তীব্র জলাবদ্ধতা। ফলে স্কুল-কলেজগামী কোমলমতি শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষ এবং সাধারণ বাসিন্দাদের নিত্যদিনের যাতায়াত এখন চরম ভোগান্তির নামান্তর।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যশোর নিউমার্কেটসহ পুরো উপশহর এলাকায় গত ৩০ বছরেও কার্যত টেকসই বা পরিকল্পিত কোনো উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এই এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন বলে মুখে দাবি করলেও, বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন মেলেনি। বরং নামকাওয়াস্তে যে ড্রেন এবং ছোট ছোট কালভার্টগুলো তৈরি করা হয়েছে, সেগুলো এখন এলাকাবাসীর জন্য ‘বিষফোঁড়া’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ড্রেনগুলোর ভেতরে পলি ও আবর্জনা জমে পানি নিষ্কাশনের পথ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টি হলেই নোংরা পানি উপচে সড়কের পাশাপাশি লোকালয় ও বাসাবাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ছে। মূলত দায়সারা কাজ করে কিছু ব্যক্তি নিজেদের পকেট ভারী করলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
উপশহরের এ, বি, সি, ডি, ই এবং এফ—সব কটি ব্লক সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, হাতেগোনা কিছু জায়গায় সড়ক মোটামুটি ভালো থাকলেও সিংহভাগ এলাকারই করুণ দশা। বিশেষ করে ‘ই-ডি-ব্লক’-এর বাসিন্দাদের অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়। দীর্ঘদিন ধরে তারা স্থায়ী জলাবদ্ধতার শিকার হয়ে আন্দোলন ও কর্তৃপক্ষের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। সড়কগুলোর পিচ ও খোয়া উঠে গিয়ে এত বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে যে, দূর থেকে দেখলে মনে হবে এটি কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকা। সম্প্রতি লোকদেখানো হিসেবে উপশহরের মূল প্রবেশদ্বার ক্লাব মোড় ও বিআরটিসি বাস স্ট্যান্ডের সামনে সামান্য একটু ঢালাই রাস্তা তৈরি করে দেওয়া হলেও, ভেতরের সড়কগুলোর শোচনীয় দশা অপরিবর্তিতই রয়ে গেছে।
এলাকাবাসীর চরম ক্ষোভের বড় কারণ হলো, এই উপশহর এলাকাটিতে বিচারপতি, সরকারের উচ্চপদস্থ সচিব, স্বনামধন্য ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এবং দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল (বিএনপি ও আওয়ামী লীগ)-এর জেলা পর্যায়ের শীর্ষস্থানীয় শীর্ষ নেতারা সপরিবারে বসবাস করেন। অথচ এই ভিআইপি এলাকায় গত তিন দশকেও টেকসই ড্রেনেজ বা সড়ক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। নেতারা নির্বাচনের আগে ও জনসভায় এলাকার উন্নয়নের ফুলঝুরি ছড়ালেও, বাস্তব ফলাফল শূন্য।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রবীণ ও সচেতন এলাকাবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের এলাকায় দেশের শীর্ষ পর্যায়ের এত এত নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা থাকেন, কিন্তু তারা কেউই সাধারণ মানুষের এই নরক যন্ত্রণা নিয়ে ভাবেন না। তারা যদি আন্তরিক হতেন, তবে আজকে এই উপশহরটি পুরো বাংলাদেশের মধ্যে একটি মডেল শহর হতে পারত। মূলত হাউজিং কর্তৃপক্ষের চরম দুর্নীতি, ঠিকাদারদের অনিয়ম আর শীর্ষ নেতাদের চরম অবহেলার কারণেই এই আধুনিক উপশহরটি আজ বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।”
দীর্ঘদিনের এই পুঞ্জীভূত ভোগান্তি, কাদা-পানি আর ভাঙা রাস্তার অভিশাপ থেকে মুক্তি চান যশোর উপশহরের সর্বস্তরের বাসিন্দারা। তারা মনে করেন, এলাকায় বসবাসকারী প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসন যদি এখনই আন্তরিকভাবে নজর দেয়, তবে খুব দ্রুতই উপশহরের এই মরণদশা বদলে একটি সুন্দর ও আধুনিক রূপ ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব। ছবি-স্ফুলিঙ্গ ।

