নিজস্ব প্রতিবেদক :
জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ এবং প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকা বায়ু দূষণের এই সময়ে অনেকেই যখন শুধু উদ্বেগের বাণী শোনান, তখন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন যশোরের ব্যবসায়ী মোঃ খায়রুল আনাম শিমুল। কোনো সরকারি অনুদান কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক সাহায্য ছাড়াই, সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে যশোর শহরের খুলনা বাসস্ট্যান্ড থেকে ঝিনাইদহমুখী ঢাকা রোড তালতলা সড়কের আইল্যান্ডগুলোকে সবুজে সবুজে সাজিয়ে এক অভূতপূর্ব চমক সৃষ্টি করেছেন তিনি।
মেসার্স শাপলা ব্যাটারি এন্ড মোটরস এবং শাপলা ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসের স্বত্বাধিকারী মোঃ খায়রুল আনাম শিমুল মূলত একজন সফল ব্যবসায়ী। তবে ব্যবসার চেয়েও বড় তার পরিচয়—তিনি একজন খাঁটি প্রকৃতিপ্রেমী ও সমাজসেবক। এলাকার পরিবেশ সুন্দর করার এক তীব্র তাগিদ থেকে তিনি নিজে শ্রমিক নিয়ে এসে সরকারি এই সড়কের আইল্যান্ডগুলোতে শত শত বিভিন্ন প্রজাতির দামি ফুল গাছ ও চারা রোপণ করেছেন। গাছগুলোর মধ্যে রয়েছে—মাধবীলতা, জবা, হাইব্রিড জবা, শিউলি, বকুল, সাইক্র্যাস ও ক্রিসমাস ট্রির মতো দারুণ সব আকর্ষণীয় ও মূল্যবান চারা। শুধু তাই নয়, পরিবেশের প্রতি তার এই ভালোবাসা আরও ছড়িয়ে দিতে ইতিমধ্যেই তিনি বিভিন্ন জাতের আরও ৪৫০টি গাছের অর্ডারও দিয়েছেন।
ব্যবসায়িক ব্যস্ততা সামলানোর পর অনেকেই যখন বিশ্রামের খোঁজ করেন, শিমুল তখন নেমে পড়েন প্রকৃতির সেবায়। তিনি জানান, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দোকানে পুরোদমে ব্যবসা পরিচালনা করেন। এরপর রাত ২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত পরম মমতায় আইল্যান্ডের এই গাছগুলোর নিজ হাতে পরিচর্যা করেন। চারা রোপণের শ্রমিক খরচ থেকে শুরু করে গভীর রাতের পরিচর্যার যাবতীয় ব্যয় তিনি একাই বহন করে চলেছেন। অর্থ খরচে কোনো ধরনের কার্পণ্য না করে নিঃস্বার্থভাবে সরকারি রাস্তায় এভাবে গাছ লাগিয়ে পুরো যশোরবাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন তিনি।
মোঃ খায়রুল আনাম শিমুলকে স্থানীয় মানুষ এক নামে চেনেন ‘গাছ পাগল’ হিসেবে। তার এই বৃক্ষপ্রেম কেবল রাস্তার আইল্যান্ডেই সীমাবদ্ধ নয়। দেখা যায়, তার পুরো বাড়ি জুড়েই যেন সবুজের রাজত্ব। শোবার ঘর, সিঁড়ির কোণ, বারান্দা থেকে শুরু করে ছাদের বিশাল বাগান—সবখানেই নানা কায়দায় থরে থরে সাজানো রয়েছে দেশি-বিদেশি ইনডোর ও আউটডোর প্ল্যান্ট। বাড়ির ছাদটি যেন এক মিনি নার্সারি, যেখানে ড্রাগন ফলসহ বিভিন্ন ফল ও ফুলের ফলন পরিবেশকে এক অপরূপ শান্তিময় রূপ দিয়েছে।
এই নিঃস্বার্থ সমাজসেবার বীজ শিমুলের রক্তেই রয়েছে। তার দাদা ছিলেন এলাকার বিখ্যাত সমাজসেবক হাজী নেয়ামত আলী, যিনি এলাকার একাধিক স্কুল ও মাদ্রাসায় নিজস্ব জমি দান করে শিক্ষার আলো ছড়িয়েছিলেন। দাদার সেই জনকল্যাণমূলক ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করেই আজ মানুষের সেবায় নেমেছেন শিমুল। নিয়ামতিয়া মহিলা মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সদস্য এবং বেশ কয়েকটি ব্যবসায়ী মালিক সমিতির এই নেতা অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলেন, “আমি কোনো লাভের আশায় বা যশের জন্য এসব করি না। যা করছি তা মানুষের জন্য এবং পরিবেশের জন্য করছি। যতদিন বেঁচে থাকবো, মানুষের সেবায় এই কাজ আমি করে যাব।”
সরকারি আইল্যান্ডে এমন দৃষ্টিনন্দন ফুলের বাগান দেখে তালতলা এলাকাসহ সমগ্র যশোরবাসী খায়রুল আনাম শিমুলের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এই মূল্যবান ফুল গাছগুলো যখন পূর্ণাঙ্গ রূপ নেবে এবং ফুল ফুটবে, তখন পুরো খুলনা বাসস্ট্যান্ড এলাকার চেহারা পাল্টে যাবে। দূষিত বায়ু ও তীব্র তাপদাহ থেকে বাঁচতে শিমুলের এই একক উদ্যোগকে বর্তমান সময়ের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত বলে মনে করছেন পরিবেশবাদীরাও। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং সমাজকে সুন্দর করার জন্য মোঃ খায়রুল আনাম শিমুলের মতো এমন নিঃস্বার্থ মানুষের আজ বড্ড প্রয়োজন। ছবি প্রতিবেদক।

