চাউলিয়া গ্রামে বাড়িতে ঢুকে পিতা-কন্যাকে কুপিয়ে জখম

চাউলিয়া গ্রামে বাড়িতে ঢুকে পিতা-কন্যাকে কুপিয়ে জখম

স্ফুলিঙ্গ  রিপোর্ট :

যশোরের সদর উপজেলার নরেন্দ্রপুর ইউনিয়নের চাউলিয়া গ্রামে জমিজমা সংক্রান্ত পূর্ব শত্রুতার জেরে এক অসহায় পরিবারের ওপর দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র ও লোহার রড নিয়ে বর্বরোচিত ও পাশবিক হামলা চালানো হয়েছে। হামলায় নাছিমা বেগম ওরফে নাছি নামে এক নারীর মাথার খুলি ভেঙে মগজের ভেতরে ঢুকে যাওয়ার মতো মরণাপন্ন ও সংকটাপন্ন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই নৃশংস ও বর্বরোচিত অপরাধের ঘটনায় দীর্ঘ চিকিৎসাকাল শেষে ভুক্তভোগী পরিবার কোতোয়ালি থানায় মামলা করতে না পেরে আদালতের শরণাপন্ন হলে বিজ্ঞ আদালতের নির্দেশে অবশেষে আজ ১৮ জুন ২০২৬ তারিখে নিয়মিত মামলা গ্রহণের আদেশ দেওয়া হয়েছে।

যশোর সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালত সূত্রে জানা গেছে, চাউলিয়া গ্রামের বাসিন্দা ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মো. সাইদুল ইসলাম বাদী হয়ে একই গ্রামের বাসিন্দা টিপু (২৭), অপু (২৫), পল্টু (৪৫) ও মাহাবুব (৫০)—এই ৪ জনের নাম উল্লেখ করে আদালতে একটি সিআর মামলা দায়ের করেন।

মামলার দালিলিক অভিযোগে প্রকাশ, গত ২৩ মে সকাল ১১টার দিকে বসতভিটার জমি সংক্রান্ত পূর্ব শত্রুতার জেরে উল্লেখিত আসামিরা রামদা, ধারালো হাসুয়া ও লোহার রড নিয়ে বাদীর বাড়িতে অতর্কিত অনধিকার প্রবেশ করে তাণ্ডব চালায়। এ সময় বাদীর বোন নাছিমা বেগম ওরফে নাছি আসামিদের বাধা দিতে গেলে ২নং আসামি অপু হত্যার উদ্দেশ্যে ভারী লোহার রড দিয়ে সজোরে নাছিমার মাথায় আঘাত করে। রডের প্রচণ্ড ও নির্মম আঘাতে নাছিমার মাথার খুলি ফেটে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে হাড়ের ভাঙা অংশ মগজের ভেতরে ঢুকে যায় এবং তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। মেয়ের এই অবস্থা দেখে পিতা হোসেন আলী বাঁচাতে এগিয়ে এলে অন্য আসামিরা ধারালো হাসুয়া দিয়ে তাঁর মাথায় একাধিক কোপ মারে। এতে তিনিও মারাত্মক রক্তাক্ত হন এবং পরবর্তীতে হাসপাতালে তাঁর মাথায় একাধিক সেলাই দিতে হয়। হামলাকারীরা বিদায় নেওয়ার সময় বাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়।

পরবর্তীতে প্রতিবেশীদের সহায়তায় রক্তাক্ত পিতা ও কন্যাকে উদ্ধার করে তাৎক্ষণিক যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে নাছিমার শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটলে চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে উন্নত ও বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় পাঠানো হয়। ঢাকার একটি নামী বেসরকারি হাসপাতালে অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চিকিৎসকরা তাঁর মাথার খুলির ভাঙা ও ক্ষতিগ্রস্ত অংশটি সাময়িকভাবে অপসারণ করে ল্যাবরেটরিতে সংরক্ষণ করেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, নাছিমার জীবন বাঁচাতে এই ভাঙা অংশটি সরানো হয়েছে এবং পরবর্তীতে শারীরিক অবস্থা একটু স্বাভাবিক হলে পুনরায় বড় ধরনের অপারেশনের মাধ্যমে তা মাথায় প্রতিস্থাপন করতে হবে।

আদালতের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে ঢাকার হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়া, নাছিমার জীবন বাঁচানোর আকুল চেষ্টা এবং পরিবারের চরম মানসিক ও আর্থিক বিপর্যয়ের কারণে ভুক্তভোগীরা তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় কোতোয়ালি থানায় গিয়ে মামলা দায়ের করতে পারেননি। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে তাঁরা ন্যায়বিচারের আশায় আজ আদালতে হাজির হন।

আদালত সূত্রে আরও জানা গেছে, আজ ১৮ জুন ২০২৬ তারিখে যশোরের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সঞ্জয় পাল মামলার মূল নথিপত্র, হাসপাতালের মেডিকেল সার্টিফিকেট ও গুরুতর জখমের বিবরণী পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পান। অপরাধের ভয়াবহতা বিবেচনায় বিজ্ঞ বিচারক বাদীর আবেদনটি সরাসরি এজাহার বা এফআইআর (FIR) হিসেবে গ্রহণ করার জন্য যশোর কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) কঠোর নির্দেশ প্রদান করেন। একই সাথে আগামী ৭ কার্যদিবসের মধ্যে থানায় নিয়মিত মামলা রুজু করে আদালতে লিখিত প্রতিবেদন দাখিলের আদেশ দেন। আদালত দণ্ডবিধির ৪৪৭, ৪৪৮, ৩২৩, ৩২৪, ৩২৫, ৩২৬, ৩০৭ (হত্যাচেষ্টা), ৫০৬(২), ১০৯ ও ৩৪ ধারার মতো অত্যন্ত গুরুতর ও অজামিনযোগ্য অপরাধের ধারায় মামলাটি গ্রহণের জন্য আদেশ জারি করেছেন, যার ফলে আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশের বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। ছবি সংগৃহীত।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *